10 November 2013

বাংলাদেশী মেয়েদের হট ছবি

শিরোনাম দেখে চমকে ওঠার কিছু নেই। আজকে আমার ব্যক্তিগত ব্লগের ট্রাফিক সোর্সে দেখলাম "বাংলাদেশী মেয়েদের হট ছবি" লিখে সার্চ দিয়ে কেউ এসেছেন। এসব লিখে সার্চ দেয়া হয়, সেই বিষয়টা জানতাম, প্রায় সবাই জানে তা। কিন্তু আমার ব্লগে এই সার্চ দেখে মেজাজ খারাপ হইসে। মানুষ বাংলাদেশী মেয়েদের হট ছবি দেখতে সার্চ করে ছবি দেখে মনের খায়েশ মিটাচ্ছেন। তাদের জন্যই আমার এই লেখা।

আমার ধারণা আমার এই লেখা যাদের চোখে এখন পড়বে বা হয়ত অনেক বছর পরে পড়বে তাদের কেউ না কেউ হলেও এইরকম কথা লিখে সার্চ দিয়েছেন। তাদের জন্য কিছু টিপ্স আমি আগেই লিখেছিলাম এই লেখাতে -- আপনি কি পর্নোগ্রাফির নেশায় আক্রান্ত??

30 October 2013

দু'আর শক্তিকে অবজ্ঞা করবেন না

কখনো দু'আর শক্তিকে অবজ্ঞা করবেন না। দু'আ একটি ইবাদাত। ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যখন বাজে চরিত্রের মহিলা কামনা পূরণ করার জন্য ডেকেছিলো, তখন তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। আল্লাহ তাকে রক্ষা করেছিলেন, পরবর্তীতে তার মর্যাদাকেও উন্নীত করেছিলেন। যারা চরিত্রকে সৎ রাখতে প্রতিকূল পরিবেশে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে নিজেকে পবিত্র রাখে, আল্লাহ তাদের জন্য রেখেছেন বিশাল পুরষ্কার। 

দু'আ মু'মিনের সবচাইতে বড় অস্ত্র। তাই, যেকোন কঠিন পরিবেশে, যখন কোথাও আশা নেই, প্রচন্ড যন্ত্রণা -- আল্লাহর কাছে চোখ ভিজিয়ে প্রার্থনা করুন। তাঁর ভান্ডারে কোন অভাব নেই, তিনি অভাবমুক্ত। তাই, দু'আ করুন। প্রচুর দু'আ করুন। যেকোন বড় চাওয়া আল্লাহর কাছে বিনীত হয়ে চেয়ে নিন। আল্লাহ আপনাকে অভাবমুক্ত, পুরষ্কৃত করবেন ইনশাআল্লাহ। 


* *
 
কোন মেয়ের "প্রেমে" (আল্লাহ মাফ করুন) পড়ে তাকে ইনবক্সে আর ফোনে যন্ত্রণা দেওয়ার চেয়ে বন্ধুবান্ধব আর পরিবারের সবাইকে বিয়ের কথা বলে যন্ত্রণা দিয়ে উদ্ধার করে ফেলা অনেক বেশি উত্তম। 

আমাদের মান সম্মান ও ইজ্জত আল্লাহর হাতে। আর, পাপাচারের মাধ্যমে ইজ্জত বাড়ে না, কমে। আল্লাহর আদেশের খেলাপ করলে ইজ্জত ধ্বংস হয়। 

প্রিয় মুসলিম ভাই ও মুসলিমাহ বোন, বিবাহপূর্ব অবৈধ সম্পর্ক প্রেম থেকে দূরে থাকুন। বিয়ের নিয়াত করুন। আল্লাহর কাছে দু'আ করুন। 

--- সাফওয়ান​

30 August 2013

যুবতী মেয়েটা

(১)
একটু ভ্যাতলা ভ্যাতলা মিষ্টি কথা, জন্মতারিখ জানা, আকাইম্মা বিষয় নিয়া আজাইরা প্যাচাল পাড়তে পারা আর ফাস্টফুডের দোকানের বিলটা দিতে পারলেই প্রেমিক হওয়া যায়। পটায়া পটায়া বহুত আকাম করা যায়। চুলগুলা না আঁচড়ালে, একটু 'ক্যাজুয়াল লুক' নিতে পারলে তো পোয়াবারো।

আধযুগ ধরে প্রেম করা পোলারে তাদের বিয়া কবে হবে তা জিজ্ঞাসা করলে কয়, 'মামা অনেক দায়িত্ব মামা। এখন আমি রেডি না, বাসাতেও রেডি না। বিয়ে করলে তো লাইফ পুরা বদলায়া যাবে।'......

বিয়ের প্ল্যান নাই কিন্তু তারা ঠিকই বছর ধইরা রেগুলার ফেসবুকের কমেন্টে কোলন স্টার মেরে কমেন্টিং করে। এই রোমান্সে রোমাঞ্চিত বন্ধুরা তাতে লাইকায়। ঢাকায় রেস্টুরেন্টে বসে, রিকসার হুড তুলে প্রেম করে। ওয়াহ ওয়াহ!! এসব ড্যূড আর চিক্সদের কাছ থেকে নতুন নতুন ঐশী সিরিজের কাহিনী সৃষ্টির অপেক্ষা কেবল... মুক্তি কই?

(২)

"ছেলের বয়স মাত্র ২৭। এখনই কীসের বিয়ে?" -- আহাহা! মাত্র সাতাশ বছর। ছেলে তো শিশুই। আজকাল তো ছেলেরা বড় থাকে যখন তার বয়স ১৭। ক্লাস ইলেভেন-টুয়েলভে পড়ে, তখন তারা বড় থাকে, ফুটপাতে, রিকসায়, পার্কে কলেজ ড্রেসপরা মেয়েদের সাথে শরীরের উত্তাপ ভাগাভাগি করে। যে ছেলে এইসব দেখে টেখে আরো ১০ বছর পার করে ফেলসে, সে শিশু না তো কী? সে তো বড়ই হয় নাই। হইলে কি আর এই দশা হইত? এই সমাজ অনেক অনেক শিশুতে ভরে থাকুক।

এখনকার সময়ের প্রবাদ তাই বদলে গেছে :

If money is lost, everything is lost,
If health is lost, something is lost.
IF CHARACTER IS LOST, NOTHING IS LOST.

(৩)

বোন, সেজেগুজে একটা ছেলের চোখের দৃষ্টি পাওয়া কিন্তু নিজেকে অপমান করা। একটা ছেলে চোখ দিয়ে শরীরটাকে স্ক্যান করতে থাকে, টের তো পাও, তাইনা? অসভ্য সমাজে তোমার আপন ভাইও হয়ত কারো শরীরের দিকে এভাবেই তাকায়। তাই বলে পুরুষরা খারাপ বলে গালি দেবে? ভালো ছেলেও কিন্তু অনেক।

কিছু মেয়ে যেমন শরীরটাকে অন্যের কাছে তুলে ধরে কারো কারো ফ্লার্টিং পাওয়ার আশায়, অমন ছেলেরাও ওটাকেই ভালোবাসে। তাই সেই অভ্যাসের বশেই ভালো মেয়েদেরকেও চোখের শিকার বানায়। এখন তারা যেমন নোংরা, আখিরাতেও এই নোংরাদের আল্লাহ আলাদা করেই পাকড়াও করবেন।

বোন, তুমি সংযত হও। আল্লাহকে ভয় করো। এই শরীরটাকে জাহান্নামের আগুণের কারণ করিয়ো না বোন। আমি তোমাদের কাছে অনুরোধ করি, আল্লাহকে স্মরণ করো, শরীরকে আবৃত রাখো। তোমার ওই কমনীয় চামড়া এখন হয়ত পুরুষের চোখ ঝলসে দিচ্ছে, একসময় আগুণ এসে তা ঝলসে দিবে এমন যেন না হয়।

26 August 2013

বৃষ্টির দিনে আমার রোমান্টিকতা

বৃষ্টি হচ্ছে, ধুম-ধাড়াক্কা বৃষ্টিতে আর হড়মড় করে বাজ পড়তেসে। ভয়াবহ ভালোলাগা। বয়ঃসন্ধিকাল থেকে বৃষ্টিতে গালে হাত দিয়া তাকায়া থাকতাম, ঠাকুরের কবিতা চলত মাথায় -- 'এমন দিনে তারে বলা যায়'। শিশুসুলভ ব্রেইন রয়ে গেলে এখনো ওই টাইপের স্ট্যাটাস মারতাম হয়ত - 'বেনু বনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।' (জসীমউদ্দিন)

এখন বালখিল্যতা একদম নাই ভিতরে। বৃষ্টিতে লক্ষ লক্ষ কবর ভিজে যায়। তাদের মাটি সিক্ত হয় এই পানিতে। এই বৃষ্টিবিলাসে আমার ভবিষ্যত ঠিকানার কথাও মনে পড়ে। অন্যায়কারীদের হাতে মরে যাওয়া সন্তানের মায়ের চোখের পানির সাথে মিশে যায় এই বৃষ্টি। এই বৃষ্টিতে খেতে না পাওয়া মানুষরা ভিজে রাস্তায়, একচিলতে ছাদের নিচের আশ্রয় না পাওয়া যন্ত্রণাদগ্ধ হৃদয়গুলো পথের ধারে বসে ভিজায় তাদের শরীর।

এমন সময়ে এই পৃথিবীতে বাস করা মানুষদের মাঝে বৃষ্টি নিয়ে সম্পূর্ণ বৃষ্টিবিলাস কেবল সুবিধাভোগী, বাস্তবতাবিবর্জিত মানুষদের পক্ষেই সম্ভব।

বৃষ্টি হৃদয়কে সিক্ত করে, সেই হৃদয় যদি আলোকিত হয়, সে জানে -- এই জলধারা ঝরার সময়ে দু'আ কবুল করার একটা সময় আছে। সেই সুবিধা ধনী-গরীব, একাকী-দোকলা, মজলুম-রোগী সবার জন্য সমান। এই অধিকার আর অনুভবটাই সঠিক, রোমান্টিসিজমের অনুভব সঠিক না।

24 August 2013

প্রিয়তমার কাছে চিঠি

ইদানিং তোমাকে প্রায়ই মনে পড়ে। তুমিও কি আমার মতন এমন অজস্র তিক্ত মূহুর্ত কাটাচ্ছ? তুমিও কি প্রায়ই সমাজের নোংরামিতে অসহায় হয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে থাকো? যখন বন্ধুরা তাদের বউদের নিয়ে/গার্লফ্রেন্ডদের হাজির করে আড্ডায়, দেখানোর আগ্রহটা থাকে প্রকট। এই প্রদর্শনেচ্ছা বুঝতে অন্তর্যামী হতে হয়না, একটু বুদ্ধি থাকলেই হয়। অফিসের কলিগ, কলেজ ও ভার্সিটির বন্ধুদের আড্ডাতে ওই মেয়েগুলো যখন অমন করে -- ওদের নিজেদেরই কি খুব স্বস্তি হয়? আমার আসলে তা মনে হয় না। আমি তাই কোনদিন যেচে পড়ে কারো সাথে আলাপ করতে বা পরিচিত হতেও যাইনি।

আমি তোমাকে এমন পুতুল বানিয়ে প্রদর্শনে বিশ্বাসী নই। তুমি আমার কাছে এত ঠুনকো নও যার মূল্য আমি পরের চোখে বুঝতে যাব। দু'জন মানুষ একসাথে যেন অনন্তকাল পাড়ি দিতে পারি তাই অনন্তের মালিকের কাছে প্রিয় আর পছন্দের হওয়াই তো আমার হৃদয়ের আজন্ম প্রত্যাশা।

'একটা এমন সঙ্গী দরকার যাকে নিয়ে ঘোরা যাবে' -- এমন মানসিকতা নিয়ে সবাই আজকাল বড়শি ফেলতে থাকে কলেজ জীবন থেকেই। পিচ্চি পিচ্চি ছেলেগুলোও সাময়িক মাস্তির লক্ষ্যে কত কিছুই না করে। এই সমাজের বন্ধনগুলো কোথায় যাচ্ছে বল তো? আমার বড্ড খারাপ লাগে। এই ছেলেমেয়েগুলোর হৃদয় সারাক্ষণ অস্থির থাকে, জ্বালাপোড়া থাকে। ভালোলাগাগুলো শরীরের ভালোলাগা, তাতে সাকীনাহ থাকে না, তাতে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে মুখ ভেজানোর অনুভূতি থাকে না।

জানিনা তুমি কোথায় আছ। খুব স্বস্তিতে নেই জানি। এমন উত্তাল অস্থির সংস্কৃতি আর কামাসক্তদের প্রচারণার সমাজে সচ্চরিত্রা নারীর চলাফেরা অনেক কঠিনই বটে। তোমার জন্য আমি তেমন কিছু করতেও পারছি না। তবে বিশ্বাস করো বোকা মেয়ে, তোমার জন্য দু'আ আমার থাকে প্রতিদিন অনেক বার করে প্রতিবেলায়। যদি বেঁচে থাকতে আল্লাহ আমাদের দেখা না-ও করান, জান্নাতের বাগানে দেখা হবে ইনশা আল্লাহ। তোমার কথা ভাবলেই আমার স্বপ্ন জাগে এমন মূহুর্তের যেখানে স্বচ্ছ পানির এক নদীর পাশে দু'জনা বসে আছি। জান্নাতের বর্ণনায় এমন চাওয়াই আমার বুকে জাগে। নিজের যত্ন নিয়ো, তোমার প্রতিদিনের দু'আতে আমাকে সঙ্গী করিয়ো।

ইতি, তোমার প্রিয়।

21 March 2013

কত কিছু যে হয়ে যায়

সবাই নাকি অনেক কিছু করে। বিশাল প্রতিষ্ঠান বানায়, অট্টালিকা বানায়, কেউ বানায় দেশ, কেউ বানায় জাতি, কেউ হত্যা করে পুরো জাতিকেই, কেউ বিশাল বড় মাফিয়া। কেউ কেউ বিজ্ঞানী, তারা অণুপরমাণূর ভিতরের হিজিবিজিও বের করে এনে পুরষ্কার নেন।

ছোট থেকেই আমি সব দেখি। দেখতে দেখতে ভাষা হারাই। আবেগগুলো আমার গভীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে আমাকে, কিন্তু আমি তবুও নিজের কথা ভাবি। হাত-পা নাড়াতে না পারা, কথা বলতে না পারা হকিন্স কীভাবে লোহিত অপভ্রংশকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে একসময় বিগব্যাং আবিষ্কার করলেন। এই তত্ত্বের না আছে, প্রমাণ না আছে তাকে অসার প্রমাণের শক্তি। তবু শক্তিশালী সেই তত্ব দেয়া লোকটা আমাদের ঢাকা শহরের সর্বনিম্ন পর্যায়ের প্রতিবন্ধীর মতন।

আমি এখনো দেখেই চলি। আমার সাথের ছেলেগুলো অনেক কিছুই আবিষ্কার করে ফেললো। কয়েকটি দেশের বিজ্ঞানীদের সেরা পুরষ্কার পেলো আমারই বন্ধুটা, একই সাথে একই জিনিস পড়লাম, ওর চাইতে আমি বেশি চিন্তা করতে পারতাম একটা সময় পর্যন্ত। তারপরের সময়গুলোই ইতিহাস লিখে দিলো। কেউ এই শহরে পচে মরে, কেউ বিশ্বজয় করে।

সবাই নাকি অনেক কিছু করে, অথচ আমি দেখলাম জীবনভর আমি কিছু করিনি। আমার যা অর্জন তা আমার নয় আসলে, এ সবই হয়ে গেছে। এই জীবনে কতকিছুই দরকার বুঝি। আজ থেকে অনেক কয়টা বছরা আগে যেই সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার ছিল -- বন্ধুরা সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবনে এগিয়ে গেছে। আমি আজো স্তব্ধ, পারিনা; আমার চারপাশ আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। আমার পক্ষে পারাও হবেনা। এই রকম বেড়াজাল আমাকে সামনে পেছনে টেনে রাখে। আমি নির্বিকার হয়ে বসে থাকি।

আমি জানি, কিছুই করিনা আমি। আমার ক্ষমতা কিছুই নেই। যখন অনেক কষ্ট হয় -- তখনো আমি আমার অসহায়ত্বকেই আবিষ্কার করি। যখন কিছু মিছু করে ফেললাম, সমগ্র অফিসে আমাকে নিয়ে আলোচনা হতে লাগলো -- তখনো আমি জানি, সবাই যেটাকে ভালো বলছে, তার অনেক অনেক ভুল রয়ে গেছে, আমি তাকে উন্নত করতে পারিনি।

অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন ছিল। অথচ আমার শক্তি নেই সিদ্ধান্ত নেবার। হয়ত একদিন মাথা চাপড়াবো। জানিনা। সম্ভবত মাথা চাপড়াবো না। কেননা, ইতোমধ্যেই সেইরকম শত-সহস্র ভুল করে ফেলেছি। আমি জানি, আমার কিছুই করার ছিলো না। আসলে, হয়ত এই তীব্রতম যন্ত্রণাতেও মুখ বুঝে সহ্য করে যাওয়ার মাঝেই নিয়তি। হয়ত এই মুখ বুজে কাউকে শেয়ার না করাটাই আমার ভাগ্যলিখন। যতবার যতজনকেই বলতে গেছি, কেউই বুঝে নাই। আমার ভাগ্যবিধাতা আমাকে পথ করে দেন না। আমিও চুপচাপ থাকি। দুই জীবনের ধ্বংসকে চোখের সামনে এগিয়ে যেতে দেখি। আশাবাদী হতে চাই, আশাবাদী হতে হয়। বড় কোন অপরাধের সাহস পাইনা। আশা করার কোন অর্জনও নাই।

আমি তো আসলে কিছু করিনা। সবই আমার ইচ্ছেটুকুই। এখন যেই তীব্র ইচ্ছা, সেটা কখনো মুখ ফুটে বের হয়নি। যখন উচ্চারিত হলো, চারপাশের আকাশ ভেঙ্গে পড়ার দৃশ্য দেখে বুঝেছিলাম -- আমার ক্ষমতা কল্পনাতীত কম। এই আকাশ তুলে স্থাপন করতে পারব না। পারব না নীল আকাশের মাঝে কোন রঙের আবির রাঙ্গাতে। আমার হাতে কিছুই নেই। সবই আমার ক্ষমতার অতীত।

এমনকি এই বাক্যগুলো লেখা? সেটার ইচ্ছাও আমার দু'দিন ধরেই ছিলো। কষ্ট জমতে জমতে যখন একটা এভারেস্ট হয়ে গেলো, তখন তাকে গলে পানির ধারা হয়ে ঝরতে শুরু করেছিলো চিন্তা। সময় আর সুযোগ হয়ে যখন লিখতে ধরলাম, তখনো তো অনেক ভাবনাই হারিয়ে গেছে। এটুকুও না হতে পারত। এটুকু হলেও বেশিকিছু হলো না, আবার কমও হলো না। গাজায় ছোট ছোট শিশুরা কাঁপছে বিমানের হামলার শব্দে, রোহিঙ্গারা হয়ত খোলা আকাশের নিচে শুয়ে, আমি যে কিছুই করতে পারিনা -- এই কষ্টগুলো এসব মানুষদের কথা ভাবলে লজ্জায় মাটির নিচে ঢুকে যায়। পালিয়ে যেতে পারেনা, মিথ্যে তো না, কেবল চিন্তার কৌণিক পার্থক্য, সময়ের প্রবঞ্চনায়।

দিনশেষে একটা কথা মনের মাঝে ঘুরতে থাকে-- সবাই এত কিছু করে, এত দম্ভ অহংকার, সবাই কি আসলেই এত অসাধারণ? সবাই কি করে পারে? আমি তেমন কিছুই করতে পারিনি। যা হয়েছে, তা আমার জানা ছিল না, হয়ে গেছে। এমন করে কত কিছুই করি, করতে চাই। হয়ত কিছু হয় বা হয়না। কত কিছু আপনাতেই হয়, তাও আমি জানিনা, বুঝিও না।

কিছু একটা হয়ে যাবার অপেক্ষায় দিন গুণে চলি... শুক্রবার, শনিবার... নভেম্বর ডিসেম্বর... ২০১২, ২০১৩... এই অপেক্ষা হয়ত শেষ হবেনা। দুই পাশে শুণ্য পেতেই হয়ত তার আগেই চিরবিদায়। কে জানে তার কথা? সে তো তখন হয়ত হয়েই যাবে, আমি করবো না।

তাল সামলানোর অন্তহীন এক যুদ্ধ হলো জীবন

আমার প্রিয় দিনগুলো অতীতে। প্রতিটা দিন যায়, জ্ঞানের পরিধি বাড়ে, পৃথিবীর ঘটনাগুলো পরিষ্কার হতে থাকে। প্রতিটি সম্পর্কের পেছনে মানুষের অনেক জটিলতা থাকে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে অজস্র ঠগবাজি থাকে, প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে থাকে অনেক অসহায় মানুষের অর্থের উপরে।

চাকুরি করতে এসে খুব অস্থির লাগে। এই অনাচারে মন টিকেনা, তবু পেটের দায়ে আঁকড়ে ধরে থাকতে হয় প্রতিটি মিথ্যার মাঝেই নিজের জায়গাটুকু। এই নীতিবোধ কোত্থেকে তৈরি হয়েছিলো জানিনা। হয়ত বাবা-মায়ের জীবন দেখেই। পুরোনো সেই বোধগুলোর সাথে জীবনের ঘটনাগুলোকে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ এক এক করে হিসেব করতে থাকি, খেয়ালে বা বেখেয়ালে, অজান্তে আপনা আপনিই।


চাকুরি শেষে ফেরার সময় আজ আমার একটা স্মৃতি মনে পড়লো। সেই স্মৃতিতে ছিলো এক ঘণ্টা ধরে ট্রেন লাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে যাবার স্মৃতি। সাথে ছিলো দুই বন্ধু। রেলের লাইনে তিনটা সমান্তরাল লাইনের ওপর তিনজনের হেঁটে যাওয়া। দূরে খেয়াল রাখতে রাখতে আমরা সেদিন পণ করেছিলাম -- কে দ্রুত না পড়ে একটা পাতের উপরে দিয়ে দূরে হেঁটে যেতে পারে।

তখনো সাধারণ বোধ হারাইনি, মনে ছিলো খেয়াল রাখতে হবে ট্রেন আসার ব্যাপারটা। দুইটা ট্রেন সিগন্যালের মাঝামাঝি জায়গায় একপাশে সবুজ ক্ষেত আর আরেকপাশে ঘরবাড়ির এলাকায় সেদিন হেঁটেছিলাম। তিনজনের মধ্যে আমিই সবার আগে পড়ে গিয়েছিলাম। দ্রুত ছিলাম না।


স্মৃতি আজ মনে পড়ে গেলো। কারণ এই শহরে শ্রম বেচে ফেরার সময় তো অমনই লাগে। আমি তাল পাইনা। ক্রমাগত পড়ে যেতে নিই। কোনমতে সামলাই। ভালো লাগেনা। খাঁচার ভেতর অচিন পাখির মতন মনে হয়। পরিবার সংসার ছেড়ে যেতে পারব না, পারব না বাউল হতে, পারব না সন্নাসী হয়ে বটগাছের নিচে বসে গান গাইতে। আসলে ওই জীবনগুলোরও অর্থ নাই।

এই তাল সামলানোর অন্তহীন এক যুদ্ধ হলো জীবন। এর শেষ কেবল একটা বাগানে গেলেই হবে। তার আগে শুধুই ছুটে চলা। তবে, চোখটা বন্ধ করে যখন তাকে অনুভব করি খুব কাছে, হৃদয়ের গভীরে, কেবল তখনই শান্তি পাই। নয়ত বুঝি টিকে থাকত পারতাম না এই জনারণ্যে - মিথ্যে, প্রবঞ্চনা, ঠাট-বাট, অত্যাচার আর অন্যায়ের এই শহরে। পড়ে যেতে নিয়ে তাই সামলে উঠি মাঝে মাঝে কিছু সুন্দর অনুভবে...

একদিন ছুটি হবে

একদিন ছুটি হবে,
অনেক দূরে যাব,
নীল আকাশে সবুজ ঘাসে,
খুশিতে হারাবো'

গানটা কেন যেন হঠাৎ করেই কানে ভাসছে। হয়ত সেই ছুটির দিনের নীল আকাশের সবুজ ঘাসে হারাতে মন চাইছে। আমার কি আর ভেসে যাওয়া হবে সেই নীল আকাশের নিচে? কই, কয়েকদিন আগেই তো গেলাম এক বিশাল সবুজ মাঠে আর নীল আকাশের নিচে। অথচ যখন এই গানটা শুনেছিলাম নতুন কুঁড়িতে মনে হয় -- তখন এমন করে যেতে পারিনি খুশিতে হারাতে। তখন আবেগ ছিল টাটকা, নিষ্কলুষ।


বয়স ঘুরে অনেক হলো। নিষ্কলুষ ভালোবাসা আর অনুভূতি আর নেই মনে হয়। একটা বয়েসে প্লেটোনিক না ফ্রয়েডীয় লাভ বেশি শক্তিশালী আর সঠিক -- তা নিয়ে তর্ক হত ফ্রেন্ড সার্কেলে। আমি সবসময়ে প্লেটোনিক লাভ টাইপের তৎকালীন কনসেপ্টে আসীন ছিলাম। সময় গেলো, বুঝলাম আমার কনসেপ্টটাই ভুল ছিল, আমি আসলে ডেফিনিশানই ভুল জানতাম। তবে, এখন জানি, যেই ভালোবাসার টানে পাশে আনে এয়ারটেল। ভ্যাসলিনের কোমলতার যেই ভালোবাসার বিকিকিনি হয় পথে প্রান্তরে -- সবই ফ্রয়েডিয় ভালোবাসা। কামাসক্ত ভালোবাসার প্রচার-প্রসার সর্বত্রই। এখন ভালোবাসা প্রেম শব্দগুলো যারা ব্যবহার করে -- তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের কিশোর বয়সের অশ্লীল জোকসগুলার কথা স্মরণ করে বিষ্ময়াভিভূত হয়ে ভাবি -- সবাই মনে হয় অনেক বদলে যায়। হয়ত বদলায় না, খোলস বদলায়, ভেতরের সেই পাশবিক দানবটা তো মরে যায়নি, নির্জনে সেই দানবটাই কি ওদের ভিতর থেকে বের হয়ে আসে না?

ইচ্ছে হয়না এইসব আলোচনায় থাকি। এই আলোচনা আমার হৃদয়কে বিষাক্ত করে। আমি সবসময় চেয়েছি সুন্দরকে জিইয়ে রাখতে। রাস্তার মোড়ে সুরুজ মিয়ার সবজির দোকানে প্রায়ই দেখি একবালতিতে পানি নিয়ে সবজিগুলোকে ক্রমাগত ভেজাতে থাকে। আমার কেন যেন তার এই প্রচেষ্টা দেখলেই নিজের কথা মনে হয়। আমিও তো অনেকবার চেয়েছি এরকম করে আমার সুন্দর স্বপ্নগুলোকে পানিতে ভিজিয়ে সজীব রাখবো। কই হলো!! সময়ের সাথে সাথে আমার ভালোবাসা, প্রেম, আর্তিগুলো কলুষিত হতে থাকে। আমি সমাজের আর দশজনের মতন নই। আমি একজন পরাজিত মানব। হিস্টেরিয়া আক্রান্ত রোগী দেখিনি, গল্প শুনেছি। এইসব বাস্তব নোংরা ঘটনাগুলো আমাকে হিস্টরিয়াগ্রস্ত করে ফেলতে নেয়। আমি আবার লুকাই। নিজের মাঝেই লুকায়। আমার আরেকটা কল্পনার জগত আছে। ওতে সাইন ইন করে ঢুকে পড়ি।

আমার একদিন ছুটি হবে ঠিক ঠিক। আমি জানি এই জগতের পর আরেকটা জগত আছে। আমি নিশ্চিত। আমি সৃষ্টির মাঝে অদ্ভুত সাম্য দেখতে পেয়েছি। পাইনি আমার স্বপ্নালোকে। আমার জীবনের স্বপ্নগুলো সবই অধরা। এটা হতে পারেনা। আমি কখনই আকাশে উড়তে চাইনি। ছোট ছোট কিছু পেতেও যখন অজস্র সময় অপেক্ষা করেছি তখনো বিনিময়ে পাইনি কিছুই। না পাওয়ার কথা বলতে চাইনা।

আমার একটা স্বপ্ন ছিল। আমার একটা হরিণ থাকবে। আমি একটা সুন্দর বনের মধ্য দিয়ে দৌড়ে যেতে থাকব। হরিণটা আমার পাশে পাশে থাকবে, দৌড়াবে। একসময় আমরা একটা ঝর্ণা দেখতে পাব। আমি দৌড়ে যখন ওখানে গিয়ে আঁজলা ভরে পানি খাবো, আমার হরিণটাও ওখানে গিয়ে মুখ ডুবিয়ে দিবে নালাতে। দু'জনে সেখান থেকে আবার দৌড়ে একটা বিশাল গাছের নিচে থামবো। আমি হ্যামক ঝুলিয়ে দিব, আমার গল্পের বই বের করে পড়তে শুরু করব।

আমার জীবনে এসব কিছু হয়নি, হবেওনা হয়ত। জগতের অনেকেরই এমন অনেক কিছু পূরণ হয়েছে। আমি ঝর্ণাও দেখিনি প্রায়। আমার বাকি আছে। আমাকে আমার স্রষ্টা অবশ্যই দিবেন। আমি তার কাছে পেতে অপেক্ষা করছি অনেক কিছুর অন্যায় ভোগ থেকে দূরে থেকে। একদিন আমার ছুটি হবে। বিশাল স্নিগ্ধ সবুজ বাগানে। আমরা ভাইবোনেরা সবাই ছুটে যাব এপ্রান্ত ওপ্রান্ত উচ্ছ্বাসে । আমি সেদিন চিতকার করে গাইবো --

'একদিন ছুটি হবে,
অনেক দূরে যাব,
নীল আকাশে সবুজ ঘাসে,
খুশিতে হারাবো'

০৬ জানুয়ারী ২০১৩, রাত ১২:০২ 

অপরাজিতা

সাদিয়া, তুমি শুনছ?
- হুঁ, বলো!
- তোমার কি অপরাজিতার কথা মনে আছে?
- তোমার ক্লাসমেট ছিলো, সেই মেয়েটা?
- হুমম। ও খুব সুন্দর কবিতা লিখত।
- বলেছিলে একবার মনে হয়।
- একবার শীতের সময়ে আমাদের ক্যাম্পাসে 'স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর ছিলো। অপরাজিতা পাঠ করেছিলো, 'রোদনের বসন্ত' নামের কবিতা।
- এ আবার কেমন শিরোনাম? অদ্ভুত তো!
- অদ্ভুতই বটে! অপরাজিতার শব্দচয়ন খুব সুন্দর ছিল। তোমার মতন নয় যদিও। তুলনা করছিনা। তবে তোমার লেখনী কোমল, আর অপরাজিতার শব্দগুলো খুব দৃঢ় গাঁথুনির ছিল।
- মনে আছে কোন পংক্তি?
- বলছি শোন :


আমার সকল উদাসীনতার নাম যদি দাও ঘৃণা,
তোমার বোধের প্রতিটি জোড়ে দিলাম তপ্ত করুণা।

- অপরাজিতাকে তোমার পছন্দ ছিল?
- ছিলো বৈকি। আমি কবিতাপ্রেমী ছিলাম, তুমি জানো।
- বলনি ওকে কখনো?
- কবিতা ভালোবাসলেই কবি ভালোবাসতে হবে বলে মনে করো তুমি?
- কবির হাতেই তো কবিতা আসে।
- কিন্তু কবিতা আমার অবসরের সঙ্গী ছিল। আমি তো চাইছিলাম জীবনসঙ্গী।
- তাহলে কীসের তোমার নির্লিপ্ততা এনেছিল?
- আমি কোমলভাষী মানুষ, শক্ত কথা আমার সয়না।
- আমি তো অনেক রূঢ় তুমি জানোনা?
- টের পাইনি এখনো।
- পাবে 'খন।
- তুমি পারবে না রূঢ় হতে। কঠিন সময়েও।
- এত নিশ্চিত হচ্ছ কী করে?
- মনে হয় আমার। তুমি তো মহামহিমের প্রিয় হতে চাও। তুমি কী করে পারবে তোমার জীবনসঙ্গীকে রূঢ় ব্যবহার করতে।
- ভন্ডামি ছাড়ো। বাস্তবতায় কাব্য মানেনা। খেপে গেলে কি আর হুঁশ থাকে?
- আমি ভন্ডামি করিনি সাদিয়া। আমি জানি একজন মানুষের সবচাইতে খারাপ ব্যবহারটাই তাকে চেনায়। সময় তো কম যায়নি। আমার বাসার সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়েও তুমি মাথা ঠান্ডা রাখতে পেরেছ দেখেই আমার ভয় কেটে গেছে। আমার সংকোচ ওটাই বড় ছিল।
- অপরাজিতারাও হয়ত পারে, সাদিয়াকে পেতে হলো কেন?
- আমি আসলে ওভাবে ভাবিই নি কখনো। প্রস্তত ছিলাম না জীবনের সবচাইতে বড় সিদ্ধান্তটার জন্য। কবিতা পাঠ করতে গিয়ে তখন অমন ভুল করে ফেললে বুঝি আফসোসে জীবন কেটে যেত।
- এভাবে বলনা। আর কেউ বুঝি জীবন কাটাচ্ছে না?
- সবার বুকের চাওয়া আর আর্তি কি এক? আমার চোখ পেরিয়ে যায় মৃত্যুর ওপারে। সফলতা আর সুখ তো ওপাশেই, তাইনা?
- এতক্ষণে কাব্যের ভ্রম কেটেছে তোমার।
- ভ্রমে থাকিনা আমি। কাব্য বলতে আমি বুঝি শব্দের বুনন। আমার কাছে কাব্যকে শীতের সকালে মাকড়সার জালে লেগে থাকা শিশির কণার মতন মনে হয়।
- এই অনুভূতিকে কী বল তুমি রিহাম? স্পর্শকাতরতা?
- বাহ! কী দারুণ করে বলে ফেললে। এই শব্দচয়নেই তোমার বিশেষত্ব।
- সে তো তোমার মনের প্রণয়াঞ্জনলিপ্ত মনের কথা, রিহাম। আমি নিজেকে চিনিনে বুঝি?
- ঠিকাছে। চুপ করে গেলুম। খুশি হলে তো?
- বেশ। হয়েছিই তো!

রঙ্গিন ফ্রেমের আড়ালে কিছু সাদাকালো অবহেলা

ইদানিং যেন খানিকটা টের পাই, সাহিত্য সৃষ্টির গোড়ায় কেমন জলের স্পর্শ থাকত। লেখকের হাত দিয়ে বেরিয়ে আসা দৃশ্যপট আর শব্দ সৃষ্টির পেছনে কোন অগ্ন্যুতপাত, তার খোঁজ কেউই জানতে পারেনা। প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে অনেক শক্তি লাগে। সেই শক্তি আপনাতেই বিচ্ছুরিত হয়না। শক্তি বেরিয়ে আসে ভিন্ন চেহারায়, ভিন্ন আঙ্গিকে। শত-শত বার কেটেছে আমার, কলম ধরে এলোমেলো এঁকেছি, শব্দ পাইনি কলমের আগায়। কীবোর্ডে চেপেছি শব্দ, আবার পেছনে এসে মুছেছি। যা চেয়েছি, তা বের হয়নি বলেই এই মুছে দেয়া, মিটিয়ে ফেলা, কেটে ফেলা।


অনুভূতিদের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অস্থিরতার একটা প্রকাশ থাকে লেখায়। কখনো থাকে সুবিন্যস্ত প্রকাশ। মাঝামাঝি কিছু হয় কি? আমি লিখছি সাহিত্যানুভূতি নিয়ে, অথচ খানিক আগেও কি সাহিত্য নিয়ে ভেবেছি? ক্ষয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়ার অদ্ভুত এক ঘোরের মাঝে কোত্থেকে সাহিত্য চলে এলো আর কেবল তখনই কিছু শব্দ বেরিয়ে এলো। হোক সেটা ছাইপাশ, শব্দ বেরিয়ে আসার এই অদ্ভুত বিষয়টা দেখেই ভাবছি -- লেখনী নির্ভর করে উনুনের জ্বালানীর উপরে। পাঠকরা হাঁড়ির সুস্বাদু খাবারগুলোকেই খেয়ে ফেলেন। অথচ এর পেছনে অনুভূতি আর চিন্তার জ্বালাগুলো উনুনে তীব্র দাহনের মতই থাকে। দাহ্য অনুভূতির হদিস কেউ নেয়না, পায়না। যারা শব্দের অর্থ বোঝে, যাদের হৃদয় থাকে, তারা হয়ত একশত জনে ১ জন বা তার চাইতেও কম -- কেবল তারাই অনুধাবন করতে পারেন যে প্রতিটি শব্দ সৃষ্টির পেছনে শক্তির প্রয়োজন হয়।

মাঝে মাঝে আমার খুব লিও তলস্তয়ের কথা মনে হয় এখনকার মতন করে। রেজারেকশন পড়েছিলাম, নেখলিউদভ আর কাতিউশার গল্প। বইটি তিনি লিখেছিলেন ১০ বছরে। একটা সাহিত্যের বুনন দশটি বছর ধরে দিন আর রাত লিখে যাওয়া -- এই অকল্পনীয় নির্ভোগ ত্যাগকে ক'জন অনুধাবন করেছেন? তলস্তয় একদিন মরে গিয়েছিলেন, তার মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল রেলস্টেশনের কুলিমজুরদের সাথে। মরে যাওয়ার আগে তিনি লিখেছিলেন ওয়ার এন্ড পিস, অ্যানা ক্যারোনিনা, রেজারেকশনের মতন কালজয়ী উপন্যাস। এই সৃষ্টিগুলোর পেছনে অমন কত ত্যাগ, কত যন্ত্রনা, কত অভিজ্ঞতা আছে -- কেউ কি কখনো ভেবে দেখে? কেউ কখনো চেষ্টা করে দেখে তার গভীরতা কতখানি ছিল?

খেয়েদেয়ে, ঘুমিয়ে, নির্ভার, নির্ঝঞ্ঝাট জীবন-যাপনের পরে কারো দিকে চেয়ে থাকলে তাকে/তাদেরকে অসফল বলেই বোধ করে মানুষ। একদিন অবশ্য সবই উদঘাটিত হবে, প্রতিটি মিথ্যা আর মূর্খতা সেদিন উন্মোচিত হবে। সুখে থেকে ধারালো অস্ত্রের ন্যায় জিহবা নিয়ে ঘুরে বেড়ালে কেউ টের পায়না জগতের অন্য অজস্র মাত্রা থাকতে পারে। টেলিভিশনের ফ্রেমের মতন এই জগতে নিজ নিজ চিন্তার ফ্রেমের দিয়ে চেয়ে থাকা মানুষগুলো কখনই বুঝতে পারেনা সে এক ভ্রমের মাঝে বসবাস করে।

কবি ও কবিতা, উপন্যাস এবং ঔপন্যাসিক জোড়ার জিনিসগুলো পুরাই ভিন্ন। কবিতা যতই মর্মস্পর্শী ও সুপাঠ্য হোক, পেছনের কবির হৃদয়ের অনুভূতিগুলোও তাকে সেইরকমেরই যন্ত্রণা দিয়ে তবেই শব্দ হয়ে বেরিয়ে এসেছে। ঔপন্যাসিকের চোখে এই সমাজ ও জগতের বিষয়গুলো ধারালো থেকে ধারালোতর হয়ে দেখা দিয়েছে বলেই সেই আঙ্গুল বেরিয়ে এসেছে এত জীবনদর্শন, দৃশ্যপট। পেছনের মানুষগুলোকে কেউ কোনদিন চিনতে পারেনি, পারেনা , চেষ্টাও করেনা -- এমন ভাবনাতে এসে বড্ড মন খারাপ হচ্ছিল।

মানুষ প্রচুর অনায্য ব্যবহার পায় চারপাশ থেকে, ক্রমাগত, আমৃত্যু।

২৭ জানুয়ারী ২০১৩, সকাল ১১:১০

কীইবা আসবে যাবে


অপরাজিতা বলেছিলো,
যেদিন সন্ধ্যায় আকাশ নীল লালের ডোরাকাটা হয়ে র'বে
যেদিন দুপুরে ঝুম বৃষ্টিতে ভেসে যাবে ধুলোমাখা রাজপথ।
যেদিন সকালে আকাশ কালো হয়ে অন্ধকার হয়ে রবে
যেদিন রাতে মূহুর্মুহু বিজলি চমকাবে, উত্তরাকাশে খসে পড়বে তারা।
সেদিন রাতে আমি তোমার জন্য প্রার্থনা করব, তুমি জেনে নিয়ো।

এই জটিল সমীকরণের অর্থ আমি বুঝিনি।
অপরাজিতা আমার জন্য অপেক্ষা করেছিল কিনা জানা হয়নি।
যেদিন সকালে কালোমেঘ জমতো, সেদিন দুপুরে ঝুম বৃষ্টি হতনা।
যেদিন আকাশে তারাখসা দেখেছিলাম, সেদিন দুপুরে বৃষ্টি হয়নি।
হয়ত অপরাজিতা চায়নি আমি তার জন্য তার বাবার সামনে যাই
ঘরের কড়া নেড়ে চাচার হাত দু'টি ধরে বলি , "চাচা মেয়েটিকে আমায় দেন।
আমি আমার জীবনের সবটুকু চেষ্টা দিয়ে ওকে সুখী করে অনন্তে সঙ্গী হতে চাই"।

অপরাজিতার কথা পত্রিকায় দেখেছি। সেরা রেজাল্ট করে আমেরিকা যাবার কথা ছিল।
মেসে থাকি,ছোট চাকরি। একটানা ব্যাঙ্ক ড্রাফট করে চাকুরির আশায় সিভি জমা দিই।
মাস শেষে বাজার আর রান্নার খরচার পরে মায়ের হাতে তেমন কিছু তুলে দেয়া হয়না।
অপরাজিতাকে পাওয়ার আকাঙ্খা ম্লান হতে থাকে। কেনই বা আসবে আমার ঘরে?
মাঝে মাঝে হেলাল হাফিজ পড়ি, ঝলসে যাওয়া অনুভূতিকে খুঁজে পাই শব্দের ভাঁজে ভাঁজে।

উপমা বান্ধবীর হয়ে খেপেছিলো, বুকের পাটা নেই তোমার?
যেতে পারনা ওদের বাসায়? কাপুরুষ নাকি? আমি নিরুত্তর থাকি।
চাচার সাথে পথে দেখা হয়েছিল আমার, কথাও হয়েছিল।
ভ্রূ-কুঞ্চিত বিরক্তির কথাগুলো আমার আজো মনে পড়ে।
সে কথা কাউকে বলিনি, উপমাকে না, শিহানকে না, সাকিবকেও না।
কী হবে বলে? কীইবা এসে যাবে জগতের এক যুবকের অসহায়ত্বে?
অশ্রুসিক্ত শার্ট শুকিয়ে যাবে একদিন। সময় গড়িয়ে যাবে।
বয়স পেরিয়ে যাবে। পথের ধারের কদম গাছটি বয়সের ভারে মরে যাবে।

কীইবা আসবে যাবে জগতের যদি নাইবা হয় স্বপ্নপূরণ,
কীইবা এসে যাবে এক যুবকের শূণ্যতায়।
যুঝতে যুঝতে তবু কিছু কাব্য লিখতে সে।
সেই কাব্যে আকাশ থাকত, নদী থাকত,
কখনো বক আর ফিঙ্গের কথা থাকত,
অপরাজিতা, নয়ন তারা আর গাঁদারও গল্প থাকত।
কোন এক নারীর কথোপকথন থাকত, কল্পনায়।

কীইবা এসে যাবে যদি আকাশে তারা নাইবা খসে,
ঝুম বৃষ্টি নাইবা হয়। অকালে মরে যায় কেউ।
কীইবা হবে ক্লান্ত প্রাণের অশ্রুমালায়।
সবই বয়ে যায় আপন নিয়মে।
স্রষ্টার সৃষ্টির অপার সৌন্দর্য এই নির্বিকার জগতে।
কিছুই হয়না, কিছুই আসবে না, কিছুতেই কিছু হবেনা।
সময় বয়ে যাবে আপন মহিমায়, শেষ দিনের মহাভাঙ্গন অবধি।

০২ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, দুপুর ০১:২৩ 

12 March 2013

ফেসবুক কি তরুণ-তরুণীদের প্রেমকুঞ্জ?

এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ার কথা জানলাম কয়েকদিন আগে। মফস্বলের মেয়ে। সদ্য ইন্টার পাশ করা তরুণী। তারও ফেসবুক আছে। পড়ার চাপ নাই, হাতে প্রচুর সময়। ভাইয়ের ল্যাপটপ ইউজ করে। ফেসবুকে তার অনেক বন্ধু আছে। তারা প্রায়ই নাকি তাকে 'প্রপোজ' করে। "কি যে খারাপ হয় ছেলেরা!" আচ্ছা, সে কি করে? প্রচুর অচেনা অজানা ছেলেদেরকে ফ্রেন্ড লিস্টে অ্যাড করেছে। যেটুকু জানি, সে তাদের সাথে চ্যাটিং-ও করে নিয়মিত।

একজন অবিবাহিতা প্রাপ্তবয়ষ্ক সুন্দরী/মানানসই তরুণী তার সময় কাটাতে নেটে ছেলেদের সাথে চ্যাটিং করতেই পারে, এবং ফলশ্রুতিতে অনেক প্রপোজ পেতেই পারে। ফেসবুকে চ্যাট করতে বসে ছেলে বনাম মেয়েরা কি নিয়ে আলাপ করে? দেশ-বিদেশ? সংস্কৃতি? দর্শন? ইতিহাস? অর্থনীতি? আপনার কি মনে হয় পাঠক? এই জগতে কয়জন আছে এরকম উন্নত চিন্তার? খুবই কম। আফটার অল, থাকলেও তারা আলাপচারিতায় আবেগীয় গল্পই করবে --এটাই স্বাভাবিক।



বাংলাদেশের পরিবারগুলাতে মেয়ে আর ছেলেরা বড় হয়ে যায় ধ্যাঙ্গা-ধিঙ্গি টাইপের। তাদের হাতে ইন্টারনেট থাকে, তাদের ফেসবুক থাকে। ভাই-বোন-বান্ধবীদের বিয়েতে সাজুগুজু করা ছবি প্রোফাইল পিকচার থাকে। এইরকম ছবিওয়ালা মেয়েদের অ্যাড করতে নব্বই শতাংশ ছেলে ভাবে না। তাদের বিবাহের কোন সম্ভাবনাই থাকে না। বিলবোর্ডে আর বিজ্ঞাপনে শুধুই প্রেম আর প্রেম। নাটকে আর সিনেমাতে শুধুই প্রেম আর প্রেম। মেয়ে সুন্দরী, অ্যাট্রাকটিভ --- ছেলেরা ম্যানলি, ফ্রেঞ্চকাট, টাইট জামা, প্যাক ওয়ালা বডি।

বেশিরভাগ সময়ে এইসব ফ্লাটারিং প্রিয় মেয়েদের ছবিগুলা ছেলেদের কম্পিউটারে জমা হয়। আমি একটা ছেলেকে চিনি, যার কম্পিউটারে হাজার হাজার ফেসবুক মেয়েদের ছবি ছিল আজ থেইকা কয়েক বছর আগেই। তার একাকীত্বের খাবার ছিল এইসব ছবি, সেইটা কাছের ফ্রেন্ডদের অনেকেই জানত।

আদর্শ নাই, মোটিভেশন নাই, কাজ নাই, বিবাহ নাই, সম্পর্ক নিয়া জ্ঞান নাই, আছে যৌবনের চাওয়া, মনের চাওয়া, দিলের চাওয়া -- ফেসবুকে বন্ধু হও, কী দিয়া ভাত খাইছ সেই গল্প করো, কই কই সাজতে যাও, কার গান শুনো, তোমার বন্ধুরা তোমাকে সময় দেয়না তারা খারাপ এইসব কথা বলো।

এরপর একদিন বলাবলি হবে,

আম্মু আমাকে বকেছে।
-- ক্যানো, রাগ কইরো না।
আমার মন খারাপ।
-- গান শুনো। মন ভালো হবে
শুনতেসি। হাবীব-ন্যান্সির গান
-- বাহির বলে দূরে থাকো?
হ্যা। আমার অনেক ভাল্লাগে এইটা।
....
....
ব্লা ব্লা
....
....
-- তোমাকে একটা কথা বলি?
কি?
-- তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে। আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
এ হয়না
-- কেন? ভালোবাসা তো স্বর্গীয়। ব্লা ব্লা ব্লা


[এরপর চলতে থাকি বলিউডি সিনেমায় দেখা ডায়লোগ, অথবা স্টার জলসার ডায়লোগ। একসময় এগুলো নিয়ে গ্যাঞ্জাম হয়। ফোনের টেপ ছড়ায়। দেখাদেখি হলে ছবি তুলাতুলি হয়। সেইগুলা ফোনে করে বন্ধুদের দেখায় ছেলেটা, বান্ধবীদের দেখায় মেয়েটা। এরপর একদিন ফ্যামিলি বাধ সাধে। বাপ মা খারাপ হয়। নইলে আরো অনেক খারাপ কিছু হয়। একান্ত ঘুরতে গিয়ে কত কীইতো হয়]


আমরা আমাদের ঘরের পুত্রকন্যাদের খবর রাখি তো? শাসন করে নতুন প্রজন্মের কেশাগ্রও যে বৃদ্ধ সম্প্রদায় কামাতে পারবেন না, সেই বিষয়ে নিঃসন্দেহ থাকা যায়। অভিভাবকত্ব জিনিসটা কত কঠিন সেইটা টের পাই। সেই সাথে ইডিয়ট পুরুষ ও মহিলারা যখন অভিভাবক হয় --তাদের প্রোডাকশন সন্তানগুলা হয় ইতর এবং অভদ্র। পরিবারের পিতামাতার চরিত্র ও আদর্শ, ভাইবোনের চরিত্র ও আদর্শ অন্যদেরকে প্রভাবিত করে।

কিন্তু সেই সাথে সবচাইতে বেশি দরকার --- মোটিভেশন, ইন্সপিরেশন।

এই মূহুর্তে আপনার ঘরের কিশোর-কিশোরীদের ভালোবাসা কি নিয়ে? তাদের কি সাহিত্য ও সংস্কৃতির ব্যাপারে ঝোঁক আছে? তারা কি জানে জীবনের উদ্দেশ্য কি? তারা কি এই ভারতীয় ছিনেমাতে ভেসে যাচ্ছে? বলিউডি গানে কি তার দিন কাটে? সুস্থ সংস্কৃতিকে তৈরি করার জন্য কাজ না করুন, আপনার অন্তত প্রার্থনা আছে তো? যারা বিকল্প কিছু সৃষ্টিতে এগিয়ে যাচ্ছেন তাদেরকে নষ্ট বলে গালি দিয়ে গর্তে না ঢুকে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন তো?

না হলে অপেক্ষা করতে থাকুন একটা দিনের। হয়ত আপনি বা আপনার পরিবার শীঘ্রই পত্রিকার পাতার একটি দুর্ঘটনার খবর হয়ে যেতে পারে। নইলে আজই জেগে উঠুন। নিজে বাঁচুন, পরিবারকে বাঁচান।


২৯ জানুয়ারী ২০১৩, সকাল ১১:০০

11 March 2013

ম্যারী এ্যান, গর্ভধারিণী, প্রেমকথা

২৩ ডিসেম্বর ২০১২, সন্ধ্যা ০৭:০০


♫♫ কালো সাহেবের মেয়ে ইশকুল পালিয়ে
ধরতে তোমার দুটো হাত
কত মার খেয়েছি মুখ বুজে সয়েছি
অন্যায় কত অপবাদ/
বয়স তখন ছিলো পনেরো তাই ছিলো
স্বপ্ন দেখার ব্যারাম
মাথার ভেতর ছিলো এলভিস প্রিসলি
খাতার ভেতর তোমার নাম/
ম্যারী এ্যান
ম্যারী ম্যারী এ্যান
ম্যারী এ্যান ম্যারী♫♫


আরিফের মাথায় ঘুরেই চলেছে গানের লাইনগুলো। গতকাল মারুফের বাসায় গিয়ে গানটা শুনলো। গানটা ক্লাস ফাইভে থাকতে শুনেছিলো পাশের বাসার আশরাফ ভাইয়ের ক্যাসেট প্লেয়ারে। তখন এরকম মোবাইলে গান বাজতো না। দুই স্পিকারের বড় ক্যাসেটে গান শুনতে আরিফ আশরাফ ভাইয়ার রুমে যেত। মাঝে মাঝে গ্লাসে করে পানি নিয়ে খাওয়াতে হত ভাইয়াকে। বিনিময়ে গান শুনতে পাওয়া যেত।

অনেক বছর আগের কথা সেটা। মারুফ কালকে আবার গানটা মনে করিয়ে দিল। ম্যারি অ্যান কোন কালো মেয়ে কে জানে। আরিফের বারবার মনে হচ্ছিলো, গানের জগতে কেউ মনে হয় পেয়ে ধন্য হয়না। না পাওয়া অনুভূতিরাই গান আর কবিতার জন্ম দেয়। "সুরঞ্জনা, যেয়ো নাকো তুমি, বলো নাক কথা ওই ছেলেটির সাথে" -- সেখানেও সুরঞ্জনা ধরা দেয়নি কবির কাছে। বনলতা সেনকে পেলে হয়ত জীবনবাবুর কবিতা লেখা হত না। লাবন্যকে পায়নি বলেই অমিতের কাব্য আরও নতুন মাত্রা পাওয়া।

আরিফের বই পড়তে ভালো লাগে। লেখকরা গভীর থেকে জীবনকে উপলব্ধি করতেন, কবিরাও করতেন। তাদের চিন্তাভাবনা আসলে জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্যবিহীন ছিলো, তাই সেখানে কবিতা পড়ে অস্থির লাগে সবারই। না পাওয়ার গল্প, গান তাই বিখ্যাত হয়। সবাইই বঞ্চিত থাকে। পাঠকরা আরো বেশি বঞ্চিত। মুভিতে নায়করা নায়িকাদেরকে পায়। তাদের পেতে হয়না। পাওয়ার আগেই সবকিছু হয় মুভিতে। হাতে হাত ধরে গান, বাহুবন্ধনে গাঢ় নিঃশ্বাস, সৌন্দর্য আর আভিজাত্য ঠিকরে পড়া মুভি-সিরিয়াল দেখে তাই ক্লাসের অভি-নীনিতা, শুভ্র-আরিয়ানা আনন্দে মাতাল হয়ে আছে। প্রতিদিন ওরা একসাথে এখানে ওখানে ঘুরতে যায়।


হাতে আরিফ আজকে গর্ভধারিণী নিয়ে বসে আছে, কানে গানটা। একটু আগে গুগল করে বের করলো এটা অঞ্জন দত্তের গান -- ম্যারি এন। আরিফের মিতুর কথা মনে পড়লো। পনের বছর বয়েসে মিতুকে ওর অপ্সরীর মতন লাগত। মিতুকে স্কুল থেকে নেমে বাসায় মেইন গেট ঢোকার পথটুকু দেখতে পেত বারান্দা দিয়ে। গায়ক ম্যারি অ্যানের হাত ধরলেও, আরিফের পক্ষে মিতুর হাত ধরতে সাহস দূরে থাক, কোনদিন কথা বলাও হয়নি। লজ্জা লাগত। মারুফ একদিন নাকি রাস্তায় কলেজ থেকে ফেরার সময় কথা বলতে চেয়েছিল। চাঁছাছোলা উত্তর পেয়ে মারুফ 'সুন্দরী রোবট' বলে ঘোষণা দিয়েছিল মিতুকে।

সাত-পাঁচ ভেবে পড়তে শুরু করে আরিফ। জয়িতার গল্প পড়ছে। জয়িতা-আনন্দ-কল্যাণ-সুদীপদের কাহিনী। জয়িতাকে বেশ ভালো লাগছে। মেয়েলি ঢং ছাড়া একটা মেয়ে। মিতুকেও ভালো লাগত। জয়িতার সাথে মিতুর মিল নেই বেশি একটা। মিতুর শারীরিক গঠন অনেক মেয়েলি ছিল। বইতে পড়ে বুঝতে পারছে, জয়িতা অনেক টিংটিঙ্গে রোগা। এরকম মেয়ে বলেই হয়ত অনেক সমাজ নিয়ে ভাবছে জয়িতা, বাবার অন্যায়কেও সহ্য করছে না। নইলে সুদীপ-আনন্দদের মতন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছেলেদের কারো সাথে ওর প্রেম শুরু হয়ে যেতে পারত।

মারুফ ইদানিং খুব প্রেম করছে। কাল ফেসবুক থেকে একটা মেয়ের সাথে চ্যাটিং করে ফোন নাম্বার জোগাড় করলো। এফএনএফ নাম্বার ফাঁকা ছিলো তাই তার আফসোস ছিলো, দু'জনেই এখন এয়ারটেল ইউজার। মারুফের আনন্দ দেখে অস্থির লাগে আরিফের। অভি, শুভ্রদের মতন এখন থেকে মনে হয় মারুফের গল্পও জামাকাপড়-গায়কগায়িকা-ফ্রাইড চিকেন হয়ে যাবে।

আরিফের মন খারাপ হয়। ম্যারি এন নামের কোন এক কালো মেয়ের মতন করে হয়ত ওর ছেলেবেলার মিতু একসময় বৃদ্ধা হয়ে যাবে। আরিফের আরো অনেকের কথা মনে হয় -- ওরাও কি এমন করেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হবে না? ম্যারিএনকে নিয়ে গান লেখা হলো -- সেই ম্যারিএন তো কোন সুখ পায়নি, টাইপ করে নখ খয়ে গিয়েছিলো। সৌন্দর্য হারিয়ে গিয়েছিলো অল্প ক'টা বছর পরেই।

আরিফের আরো মন খারাপ হয়। বইতে মন দেয় আরিফ। আনন্দের মা-কে খুব ভালো লাগে আরিফের। ওর মা এমন না। ওর ফ্যামিলিটা কল্যাণদের মতন। হাত-পা বাঁধা জীবন। বাসায় ক্যাচালের যন্ত্রণায় এই গল্পের বইটাই আরিফের একমাত্র প্রশান্তি, অবসরের বন্ধু। কালকে ক্লাসে জেরিন জিজ্ঞাসা করছিলো আরিফকে, "আরিফ, তুমি এত মনমরা থাক কেন?" আরিফ আরো লজ্জা পেয়ে গিয়েছিল, বুকের কষ্ট দলা পাকিয়ে গিয়েছিল। সে জানে, তার কথা জেরিনকে বলা যাবে না। জেরিনের দিকে তাকানো যায়না টাইপের সুন্দরী মেয়ে। গত টার্মে জেরিনদের হলের সামনে গিয়ে ওকে নোট দিয়ে আসতে গিয়ে চুলখোলা জেরিনকে বের হতে এসে দেখেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো আরিফের। এরপর থেকে জেরিনকে এড়িয়ে চলে আরিফ। সামাজিক ব্যবধান অনেক, জেরিন ওর পারিবারিক অবস্থান জেনে ফেললে হয়ত এই দামটুকুও আর দিবেনা।

হঠাৎ একটু অস্থির লাগে আরিফের। কেমন যেন। সন্ধ্যা হলো মাত্র। কী করবে বুঝতে পারছে না। মারুফদের বাসায় যাবে কিনা ভাবতে গিয়ে খেয়াল হলো মনে হয় ফোনে কথা বলছে এখন, ফোন দিয়ে ট্রাই করে দেখে সেটাই -- কল ওয়েইটিং!! বাসায় ভাই-ভাবী আবার ঝগড়া শুরু করেছে। একটু পরে এখানে মা ঢুকবে -- চিতকার শুরু হবে। একটু শান্তি পেতে ইচ্ছা করে আরিফের। কেউ একটু গল্প কি করবে না ওর সাথে? এই মুহুর্তের একাকীত্ব আর নিঃসঙ্গতাকে অনুভব করে খুব অসহায় লাগে আরিফের। হাত-পা বাঁধা একজন কয়েদির কি এমনই লাগে?

মিশরের প্রেসিডেন্ট মুরসি ক্ষমতা গ্রহণের পর অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন

২৬ জুন ২০১২, বিকেল ০৫:৪৫ 

নির্বাচনে জয়লাভের পর সাধারণত একজন প্রেসিডেন্টের জীবন পাল্টে যায়। আলীশান বাসভবনে থাকার ব্যবস্থা, অফিসে-আদালতে তার ছবি টাঙ্গানো, পথে যাতায়াতের সময় সমস্ত যানবাহন থামিয়ে প্রেসিডেন্টের গাড়ির বহর যায়, আগে যেসব মানুষ কাছাকাছি থাকতেন আর দেখাসাক্ষাত করতেন তারাও প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করতে পারেন না গার্ডদের কড়াকড়িতে। আগের মানুষ আর প্রেসিডেন্ট মানুষ বদলে যায় অনেক বেশি।

মিশরের ইসলামিক রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রাক্তন নেতা, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডক্টর মুহাম্মাদ মুরসি দ্বায়িত্ব গ্রহণের পরেই এইসবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।


তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী আশা-জাগানিয়া যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন সেগুলো হলোঃ

ডক্টর মুরসি বলেছেন তিনি তার বর্তমান বাসভবনেই থাকবেন এবং প্রেসিডেন্টের আলিশান বাসভবনে তিনি ও তার পরিবার উঠবেন না।

প্রেসিডেন্ট মুরসি বলেছেন তার ছবি যেন সরকারী অফিস এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে লাগানো না হয়।

তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী ইউনিয়ন ও অর্গানাইজেশনগুলো যেন তার প্রেসিডেন্সি উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অর্থ এবং সময়ের অপচয় না করে।

রিপাবলিকান গার্ডদের মুরসি জানিয়ে দিয়েছেন যে, পথে যাতায়াতের সময় যেন সাধারণ মানুষের পথরোধ করে তাদের কষ্ট দেয়া না হয়। তিনি আর একজন মিশরের জনগণ হিসেবেই চলাচল করতে চান।

বিপ্লবে নিহত মানুষদের পরিবারকে তার দপ্তরে দেখা করতে যেন রক্ষীরা কখনো বাধা না দেয়।




আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ডক্টর মুরসির ভূমিকাও দৃষ্টান্ত স্থাপনকারীঃ

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ মিশরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানালে তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমরা সিরিয়ার সরকারের কাছ থেকে কোন অভিনন্দন গ্রহণ করবো না কারণ এই সরকার সিরিয়ান মিলিটারির প্রতিনিধিত্ব করছে যারা অবিচারে সিরিয়ার হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করছে।

মিশরে নিযুক্ত ইরানের রাস্ট্রদূতের সাথে ডক্টর মুরসি সাক্ষাত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে তাদের জানানো হয় যতদিন ইরান সিরিয়ার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি না বদলাবে, ততদিন মিশরের প্রেসিডেন্ট ইরানের সাথে তার এই অবস্থান পরিবর্তন করবেন না।

আত্মপ্রত্যয়ী, চমৎকার আশা-জাগানিয়া একটি শুরু করেছেন মুরসি। দেখা যাক ইসলামি রাজনীতি থেকে ক্ষমতায় যাওয়া এই প্রেসিডেন্ট আগামী সংকটময় দিনগুলোতে কতটুকু করতে পারেন মিশরের রাজনীতিতে।

চলে গেলেন মহীয়সী নারী উস্তাদা মারিয়াম জামিলাহ

আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন একজন মহীয়সী নারী, মারিয়াম জামিলাহ। মারিয়াম জামিলাহ নিউ ইয়র্ক সিটিতে জার্মান বংশোদ্ভূত ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৪ সালের ২৩ মার্চ। তার নাম রাখা হয়েছিল মার্গরেট মারকাস। তিনি কৈশোরেই জুদাইজম এবং অন্যান্য ধর্মবিশ্বাস নিয়ে আগ্রহী ছিলেন এবং পড়াশোনা করেন। সত্যের প্রতি ও জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি ১৯৬১ সালে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন। তিনি তিরিশটির বেশি বই লিখেছেন। আল্লাহর দ্বীনের জন্য আজীবন ত্যাগ স্বীকার করা জ্ঞানী, গুণী এই মানুষটি ২০১২ সালের ৩১ অক্টোবর আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ডাকে পাড়ি জমান পৃথিবী ছেড়ে।


মারিয়াম জামিলাহ বেড়ে ওঠেন সেকুলার পরিবেশে। তিনি নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় ধর্মের প্রতি আগ্রহবোধ করেন। তার নিজস্ব পরিবেশে ধর্মশিক্ষার কোন নির্দেশনা না পেয়ে তিনি অন্যান্য ধর্মের প্রতি জানতে আকৃষ্ট হন। তার এই আগ্রহ ও আকর্ষণ তাকে অনেকগুলো ধর্মের বিষয় জানতে, বিভিন্ন ধর্মের গভীরের তাৎপর্য জানতে সাহায্য করে। হাই স্কুলে পড়ার সময়ই তিনি এশিয়ান এবং বিশেষ করে আরব কালচারের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। আরব এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলের অত্যাচার ও অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করতেন তার পরিচিতজনদের কাছে তখন থেকেই। একটি সূত্র থেকে জানা যায়, তিনি হলোকাস্টের ছবি থেকে ফিলিস্তিনিদের দুঃখ-কষ্টের প্রতি আগ্রহী হন, পরবর্তীতে একটি ইহুদীবাদী তরুণ গ্রুপে যান এবং অবশেষে ইসলামের মৌলিক ধারার প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৫৪ সালে তিনি ইসলাম-এর সাথে পরিচিত হন।


মারিয়াম জামিলাহ মারমাদুক পিস্কথালের কুরআনুল কারীমের অনুবাদ পড়ে মুগ্ধ হন। পরবর্তীতে তিনি মুহাম্মাদ আসাদের 'রোড টু মক্কা' পড়ে অনুপ্রাণিত হন। মুহাম্মাদ আসাদও ইসলামে ফিরে আসা একজন ইহুদি পরিবারে জন্ম নেয়া মানুষ ছিলেন। উস্তাদা মারিয়াম জামিলাহ পরবর্তীতে মুহাম্মাদ আসাদের এই বইটিকে তার ইসলামে ফিরে আসার পেছনে প্রভাব রেখেছিল বলে উল্লেখ করেন।


ইসলাম নিয়ে তার এই পড়াশোনার ফলে তিনি বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন আর তার বিশ্বাসের একজন মুখপাত্র হয়ে পড়েন। তিনি ইসলাম গ্রহণের আগেই ফিলিস্তিনের প্রতি পাশ্চাত্যের মানসিকতার বিরুদ্ধে কথা বলেন, মুসলিম বিশ্বাস নিয়ে পাশ্চাত্যের ভ্রান্ত সমালোচনার বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকেন -- যা তার ব্যক্তিগত জীবনকে অশান্ত করে তোলে। তবু তিনি সমস্ত বাধা-বিপত্তিকে সাথে নিয়েই তার প্রতিবাদ অক্ষুণ্ণ রাখেন।

১৯৬১ সালের ২৪ মে তিনি নিউ ইয়র্ক শহরে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর দক্ষিন আফ্রিকার ডারবান থেকে প্রকাশিত পত্রিকা মুসলিম ডাইজেস্টে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। এই জার্নালে লেখালেখির সময় উস্তাদা মারিয়াম জামিলা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদীর চিন্তাধারার সাথে পরিচিত হন, যিনিও একই পত্রিকায় লিখতেন। তিনি আবুল আলা মওদূদীর চিন্তায় অনুপ্রাণিত হন এবং তার পাশ্চাত্য এবং ইসলাম নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা মাওলানার সাথে শেয়ার করেন। সেই চিঠিগুলো পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশিত হয়।

উস্তাদা মারিয়াম জামিলাহ ১৯৬২ সালে পাকিস্তানে পাড়ি জমান ইসলামের প্রতি ভালোবাসায়। পেছনে তার পরিবার-পরিজনসহ সবকিছুকে ত্যাগ করে আসেন দ্বীনকে আঁকড়ে ধরতে এবং তার সাধ্যমতন কাজ করে যেতে। তিনি পাকিস্তান জামায়াত-ই-ইসলামির একজন নেতা, মুহাম্মাদ ইউসুফ খানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পাকিস্তানে আসার পর থেকে অনেক লেখালেখি করতে থাকেন। তার চিন্তাধারার বৈশিষ্ট্যই হলো আধুনিক বিশ্বের এই প্রেক্ষাপটে পাশ্চাত্য এবং মুসলিম সভ্যতার দ্বন্দ্বগুলো নিয়ে এবং তার গভীরতম বিষয়গুলো নিয়ে। তিনি নিজে পাশ্চাত্য এবং ইহুদি বিশ্বাস ও চেতনার পরিবেশে বেড়ে ওঠা বলে তার এই উপলব্ধি অত্যন্ত গভীর আর সূক্ষ্ম।


মারিয়াম জামিলাহ তার জীবনে দু'হাত ভরে লিখে গেছেন। ইসলামিক মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতি নিয়ে তিনি অজস্র বই লিখেছেন যা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বৈপ্লবিক। এই মহীয়সী নারীর মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় -- বিগত কয়েক দশক ধরে আমরা ক্রমাগত ইসলামের আলোয় আলোকিত মুক্তার মতন ঝলমলে প্রাণগুলোকে হারাচ্ছি এই পৃথিবী থেকে। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাদের জীবনকে কবুল করে নিন। উস্তাদা মারিয়াম জামিলাহর বর্ণাঢ্য ও ত্যাগে ভরা জীবনকে কবুল করে তাকে যেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মর্যাদা দান করেন।


তাঁর লেখা প্রায় তিরিশটি বইয়ের কয়েকটি হলো -
1. ISLAM VERSUS THE WEST
2. ISLAM AND MODERNISM
3. ISLAM IN THEORY AND PRACTICE
4. ISLAM VERSUS AHL AL KITAB PAST AND PRESENT


সূত্রঃ

১) উইকিপিডিয়া : মারিয়াম জামিলাহ
২) বই - ইসলাম ভার্সাস দি ওয়েস্ট / বায়োগ্রাফি অংশ
৩) মারিয়াম জামিলাহ -- সাহিত্যকর্মের উপরে তৈরি ব্লগ

28 November 2012

মিশরের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মুসলিম ব্রাদারহুড এবং প্রেসিডেন্ট মুরসির বিগত পাঁচ মাস : একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

মিশরে একটা উত্তাল সময় চলছে। প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসি আরেকটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। হোসনি মুবারকের ৩২ বছরের শাসনামলের পতনের পর থেকেই কিছু শাসনযন্ত্রীয় জটিলতায় ভুগছে মিশর। প্রকান্ড সেইসব সমস্যা নিয়ে একটি দেশের প্রশাসনকে চালু রাখতে বেগ পেতে হচ্ছে প্রেসিডেন্ট মুরসিকে। তবে ইতিমধ্যে তিনি সমস্ত সমস্যাই সফলতার সাথেই অতিক্রম করেছেন।  মার্কিনী ও ইসরাইলিদের বন্ধুসুলভ সরকার ছিলো হোসনি মুবারকের প্রশাসন। ভৌগলিক কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির কারণেও মিশর সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।



২৫ জানুয়ারির সেই আন্দোলনের পর মুবারকের পতন অনিবার্য হয়ে যায়। সেই বিক্ষোভ ও আন্দোলনে সকলেরই অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। পরবর্তীতে দেশে নির্বাচন হয় এবং নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড মুভমেন্টের রাজনৈতিক দল ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি (এফজেপি) সংখ্যাগরিষ্টতা লাভ করে এবং সালাফি আল-নূর পার্টির সাথে পার্লামেন্ট গঠন করে। সেই সময়ে হোসনি মোবারক ক্ষমতা ছেড়ে দিলেও প্রশাসনের সমস্ত ক্ষেত্রেই ছিল মোবারকপন্থী লোক। তখন দেশের সর্বময় ক্ষমতা ছিলো SCAF সুপ্রিম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্সেস এর হাতে, যার প্রধান ছিল ফিল্ড মার্শাল হুসেইন তানতাওয়ি, মোবারকের একনিষ্ঠ সহযোগি। দীর্ঘকাল চড়াই উতরাই পেরিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এগিয়ে আসে, সুপ্রিম কাউন্সিল আয়োজন করে নির্বাচনের। কিন্তু নির্বাচন পূর্ববর্তী বিভিন্ন রকম নিয়মকানুনে প্রেসিডেন্ট পদের প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েন অত্যন্ত জনপ্রিয় সালাফি নেতা শায়খ হাজেম সালাহ আবু ইসমাইল এবং মুসলিম ব্রাদারহুদের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও প্রখ্যাত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী খায়রাত আল শাতের। ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টির হয়ে দ্বিতীয় নমিনেশন ছিলেন ডক্টর মুরসি। 

আন্দোলন করে একনায়কের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করা জনগনের সামনে তখন ছিলো মূলত চারজন প্রতিযোগি -- ব্রাদারহুডের নির্বাচিত মুহাম্মাদ মুরসি, ব্রাদারহুড থেকে প্রত্যাখ্যাত অপর নেতা আব্দুল মুনিম আবুল ফুতুহ, বামপন্থী সেকুলারদের পছন্দ আমর মুসা এবং মোবারকের সময়ে প্রধানমন্ত্রী আহমেদ শফিক। আবুল ফুতুহ এবং আমর মুসার জনপ্রিয়তা খুব একটা ছিলো না। দেশের জনগনের সামনে ছিলো মূলত দু'টি পছন্দ -- আহমেদ শফিক এবং মুহাম্মাদ মুরসি। অকল্পনীয়ভাবে ভোটের ফলাফলে আহমেদ শফিককে এগিয়ে থাকতে দেখে আঁতকে ওঠে জনগণ। তবে, এখানে ব্রাদারহুডের কাজ ছিলো সুনিপুণ এবং সূক্ষ্ম। প্রতিটি কেন্দ্রে ছিলো তাদের উপস্থিতি, যারা কেন্দ্রের ফলাফলগুলোর রেফারেন্স কপি প্রমাণসহ রেখে তারা কেন্দ্রীয়ভাবে রক্ষনাবেক্ষন করে ফেলে। যেকোন সরকারি বেসরকারী সংগঠন ফলাফল হিসেব করতে বসার আগেই ব্রাদারহুদের রাজনৈতিক দল এফজেপির পক্ষ থেকে নির্বাচনী ফলাফলের একটি বই প্রকাশ করা হয়ে যেখানে ৫১ ভাগ ভোট এককভাবে পেয়েছিলেন ড মুরসি। নিয়মানুযায়ী প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই ৫০% এর বেশি ভোট পেতেই হবে। যদিও আহমেদ শফিক ভিন্ন প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর চেষ্টা করেছিল এবং তার পক্ষেই ছিল মিশরের ক্ষমতার উৎস সুপ্রিম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্সেস। তবু শেষ পর্যন্ত সেই ষড়যন্ত্র নস্যাত হয়ে যায় কিছু ঐতিহাসিক মূহুর্তের কাছে।  ফলাফল প্রকাশের দিন জনগণ আতঙ্কিত ছিল। আহমেদ শফিকের কাছে প্রেসিডেন্সি যাওয়া মানে আবার সেই পুরোনো চক্রে হারিয়ে যাওয়া মিশরের মানুষের চাওয়া পাওয়া। সেদিন তাহরির স্কয়ারে মানুষ অপেক্ষা করতে থাকে সকাল থেকেই। ফলাফল প্রকাশের পর চিৎকার করে ওঠে সারাদেশ, হয়ত সারাবিশ্বেই। মুরসির প্রেসিডেন্সিতে আবেগাপ্লুত হয়ে আনন্দিত হয়েছিল তখন দেশের সালাফি-ইখওয়ানি-সেকুলার-খ্রিষ্টান সকলের। এদিকে পার্লামেন্ট নিয়ে কিছু নাটকীয়তা হয়। পার্লামেন্ট নির্বাচনকে অকার্যকর ঘোষণা করে বিচারবিভাগ -- ফলে নতুন সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা পুনরায় সুপ্রিম কাউন্সিলের হাতেই থাকে। প্রেসিডেন্টকে পুতুল বানিয়ে ফেলার পথ তৈরি করার দিকে এগিয়ে যায় প্রশাসন। মুরসি সেই সময় বুদ্ধিমান ও চৌকস প্রেসিডেন্টের মতন হাল ধরেন। সুপ্রিম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্সেস তাদের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করার আগেই তার প্রধান ফিল্ড মার্শাল তানতাওয়ি এবং সেনাপ্রধান সামি আদনানকে অবসরে পাঠানো হয়। তবে তাদেরকে তিনি দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা 'অর্ডার অব নাইল' পদকে ভূষিত করেন এবং সুচারুরূপে পরিস্থিতি সামাল দেন সেনাবাহিনীর মাঝে অরাজকতা তৈরি হওয়াকে এবং সর্বোপরি দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জটিলতা সৃষ্টি থেকে। সুপ্রিম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্সেস এর নতুন প্রধান করা হয় আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসি, যিনি একই সাথে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্বপালন করবেন।  এরপর দেশের অর্থনৈতিক এবং সামগ্রিক পুনর্গঠনে মন দেন মুরসি। ফিলিস্তিনে ইসরাইলের আক্রমণে প্রায় দুই শতাধিক প্রাণহানি হয় এক সপ্তাহে, মুরসি সতর্ক হুঁশিয়ারি দেন ইসরাইলকে, কূটনীতিবিদকে দেশে ফিরিয়ে আনেন ইসরাইল থেকে। পরবর্তীতে তার মধ্যস্থতায় ইসরাইল আক্রমণ বন্ধ করার চুক্তি করে হামাসের সাথে। এই কাজটি প্রশংসিত হয় সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কাছে।

এই সময়েই বিভিন্ন গোপন সূত্রে মুরসি প্রশাসনের কানে আসে বিচার বিভাগ প্রেসিডেন্টকে অকার্যকর ঘোষণা করে পুনরায় সেনাবাহিনীকে ক্ষমতায় আনবে। এরপরেই মুরসি ডিক্রি জারি করেন, যার মাধ্যমে তিনি বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তগুলো প্রেসিডেন্টের আওভাভুক্ত করেন। জেনারেল প্রসিকিউটর মেগুইদ মাহমুদকে তিনি প্রত্যাহার করেন। এই ডিক্রির ফলে প্রেসিডেন্টের হাতে বিশাল ক্ষমতা বিচার বিভাগের স্বেচ্ছাচারীতা আর সম্ভব নয়।  এই ডিক্রির পজিটিভ দিক হল -- এর ফলে মোবারকের সময়ে করা হতাকান্ডগুলোকে বিচারের আওতায় আনা যাবে। যা পূর্বে বিচারবিভাগ রহিত করে দিয়েছিল। ফলে পূর্বেকার হিসেবে মোবারক এবং তার প্রশাসনের সবাই বিচারের বাইরে চলে গিয়েছিল। হোসনি মোবারকের পতন আন্দোলনে জড়িত সবাই এই সিদ্ধান্তে আনন্দিত হয়েছে, আনন্দিত হয়েছে দেশবাসী, যা চলমান সকল জরিপেই দেখা যাচ্ছে। এই ডিক্রির ফলে পজিটিভ মতামত দিচ্ছেন বোদ্ধারা, কেননা এর ফলে মিশরে দীর্ঘদিন যাবত চলে আসা প্রেসিডেন্ট-প্রশাসন-বিচারবিভাগের ক্ষমতার গোলক-ধাঁধা একটি পরিচ্ছন্ন রূপ পাবে। 

প্রেসিডেন্ট মুরসি এবং তার প্রশাসন জানাচ্ছেন প্রেসিডেন্টের এই ক্ষমতা কেবলই অল্প সময়ের জন্য নেয়া হয়েছে, যা কেবল বিবাদমান জটিল পরিস্থিতির সমাধানের জন্য। মিশরের রাজনৈতিক বোদ্ধা এবং সমালোচকরা এই সিদ্ধান্তকে বলিষ্ঠ ও বুদ্ধিদীপ্ত বলে মনে করছেন। তবে এরপরেও দেশে ভাংচুর হচ্ছে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক দল এফজেপির অফিসগুলো। অরাজক পরিস্থিতিকে উসকে দিচ্ছে বামপন্থী সেকুলার কিছু দল, যার মনে করছে এই ক্ষমতা ইসলামিক দলগুলোর হাতে চলে গেলো।

এছাড়া মোবারকের মদদপুষ্ট বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে থাকা লোকেরাও এই ডিক্রি ঘোষনার পরবর্তী সহিংসতায় উসকানিমূলক ভূমিকা রাখছে। শেষ খবর জানা পর্যন্ত, প্রেসিডেন্ট মুরসি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন, আলোচনার জন্য তিনি বিচারবিভাগের উর্ধতন অনেকের সাথে সংলাপের জন্য ডাক দিয়েছেন।  মোটকথা, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির একটা কন্ট্রোল মিশরের উপরে হওয়ায় দেশের এবং বাইরের অজস্র শত্রুভাবাপন্ন, কূটকৌশলী ও কূটনৈতিক সমস্যাকে মোকাবেলা করে, ইসলামি রাজনীতি নিয়ে শত্রুভাবাপন্ন আরেক জনগোষ্ঠিকে বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে মোকাবেলা করে তুলনামূলক দুর্বল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার কঠিক কাজটি করতে হবে প্রেসিডেন্ট মুরসিকে। তার সামনের সময়কে সহজ বলা যাবে না। তবে, মুসলিম ব্রাদারহুড এবং এফজেপি এখন পর্যন্ত বিগত দু'বছর ধরে প্রায় সবক্ষেত্রেই রাজনৈতিক কৌশলে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আগামীতে কীভাবে তারা এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবেলা করে -- তা দেখার বিষয়। 


 সাম্প্রতিক লিঙ্কঃ দি অ্যারাবিস্ট আর্টিকেল - ইসান্দার আল আরমানির লেখা 

রাশিদ আল ঘানুশি : তিউনিশিয়ার ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ



রাশিদ আল ঘানুশি একজন ইসলামি স্কলার এবং রাজনীতিবিদ। তিউনিশিয়ার ক্ষমতাসীন দল এবং সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলন "আননাহদা মুভমেন্টের" প্রতিষ্ঠাতা তিনি। রাশিদ আল ঘানুশিকে আন নাহদার "স্পিরিচুয়াল লিডার" বলা হয়ে থাকে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধর্মনিরপেক্ষ, একদলীয় শাসনব্যবস্থায় বিরক্ত জনগণের কাছে ঘানুশির আননাহদা মুভমেন্ট তিউনিশিয়ার মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায় এবং ফলশ্রুতিতে নির্বাচনে জনসমর্থন পেয়ে কোয়ালিশন করে সরকার গঠন করে আরো কয়েকটি দলের সাথে। রাশিদ ঘানুশির মুভমেন্টের নাম "আন-নাহদা", যে শব্দটির অর্থ রেঁনেসা বা পুনর্জাগরণ।



রাশিদ আল ঘানুশি দক্ষিন তিউনিশিয়ার কাবিস অঙ্গরাজ্যের আলহামা সংলগ্ন এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪১ সালে। কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাগ্রহণ শেষে তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ এগ্রিকালচারে শিক্ষাজীবন শুরু করেন ১৯৬৪ সালে। কিন্তু মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দেল নাসের এবং তিউনিশিয়ার প্রেসিডেন্ট হাবিব বোরগুইবার সমস্যার কারণে তিনি সিরিয়ায় চলে যান। সেখানে ইউনিভার্সিটি অফ দামস্কতে দর্শনের উপরে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি গ্রাজুয়েশন করেন। দামেস্কতে থাকার সময় তিনি সমাজতান্ত্রিক পার্টিতে যোগদান করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ঝুঁকে পরেন।


তিউনিশিয়ার সেকুলার পাশ্চাত্যপ্রেমী প্রেসিডেন্ট হাবিব বোরগুইবার শাসনের বিপরীতে কোন রাজনৈতিক দলই ছিলনা দেশে। ঘানুশি আল-ইত্তিহাদ-আল-ইসলামি বা ইসলামিক টেনডেন্সি মুভমেন্ট নামের একটি দল প্রতিষ্ঠা করেন। যেই দলটি নিজেদের বর্ণনায় বলে এটি "নন-ভায়োলেন্ট' ইসলামের উপরে প্রতিষ্ঠিত এবং তারা আহবান জানায় অর্থনীতিকে ঢেলে সাজিয়ে একটি সমন্বয়পূরণ জীবন গঠনের জন্য। তারা বলেছিলো একদলীয় রাজনীতির অবসান করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে নিতে তারা জনগণকে আহবান জানায়।

জুলাইয়ের শেষে ঘানুশি এবং তার সহযোগীরা গ্রেফতার হন এবং ১১ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত করে বিজার্ত কারাগারে পাঠানো হয় এবং সেখানে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা হয়। সেইসময় ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ কমিউনিটিরা সহ অজস্র রাজনৈতিক সংগঠন তার পক্ষ অবলম্বন করে মুক্তির জন্য র‍্যালি করে। ১৯৮৪ সালে তাকে কারামুক্ত করা হয়। কিন্তু ১৯৮৭ সালে রাশিদ আল ঘানুশিকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করে আবার বন্দী করা হয়। ১৯৮৮ সালে তিনি মুক্তি পান এবং রাজনৈতিক নির্বাসনে ইউরোপে চলে যান।




[ছবি : ১৯৮০ সালে একটি ইসলামিক র‍্যালিতে বক্তব্য রাখছেন ঘানুশি]

ফিলিস্তিনের জন্য ইসলামিক কমিটির পক্ষে আয়োজিত কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেন ১৯৮৯ সালে। ১৯৯০ সালে কুয়েতের উপরে আক্রমনের পর তিনি সৌদির বাদশাহ ফাহাদকে জঘন্য অপরাধকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেন আমেরিকার সৈন্যদেরকে সেখানে আমন্ত্রণ জানানোর অভিযোগে।

ইউরোপে গিয়েও ঘানুশি বোরগুইবার পরবর্তী শাসক জাইন আল আবেদিন বেন আলির বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে থাকেন। কিন্তু জানুয়ারি ২০১১ এর পরে তিউনিশিয়ার গণমানুষের আন্দোলনে একনায়ক বেন আলির পতনের পরে তিনি দেশে ফিরে আসেন ২০ বছরের নির্বাসন ভোগের পরে। দেশে ফিরে নির্বাচনপূর্ব জনমত গঠনে তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ভ্রমণ করেন, বিশেষজ্ঞরা তার এই কাজটিকে সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বলে অভিহিত করে নির্বাচনের পরে। কেননা একনায়ক শাসনের পরে আননাহদার সমান সংগঠিত হয়ে উঠতে পারেনি আর কোন রাজনৈতিক দল।

২০১১ সালের ২২ জানুয়ারিতে আল জাজিরা টিভির সাথে একটি সাক্ষাতকারে রাশিদ ঘানুশি বলেন, তিনি জোরপূর্বক হিজবুত তাহরিরের মতন ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একমত নন। বরং তিনি উন্নয়নমুখী উদার ইসলামিক ভিত্তির উপর দাঁড়ানো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী, তিউনিশিয়ায় দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সেকুলার জীবনব্যবস্থায় ভুক্তভোগী জনগনকে ২০১১ আন্দোলন করতে বাধ্য করা জনমানুষের অন্তরকে ইসলামের প্রতি নরম করবে। সৌদি আরব এবং ইরানে শাইখ রাশিদ আল ঘানুশির প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি আছে।

তিনি সকল তিউনিশিয়ানের সমতা আনয়নের ব্যাপারে জোর দেন, বিশেষ করে নারীদের। এছাড়া তিউনিশিয়ার জনগণের মত গ্রহণের জন্য একটা সরকারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। গণতান্ত্রিক অ্যাপ্রোচ ঘানুশিকে অন্যান্য হাই-প্রোফাইল ইসলামপন্থীদের চাইতে আলাদা করেছে, যদিও তিনি মধ্যপ্রাচ্যে অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর নিজেদের পথ নিজেরাই বেছে নেয়ার উপর জোর দিয়ে থাকেন।

২০১১ সালের মে মাসে একটি সাক্ষাতকারে ঘানুশি বলেন, ফিলিস্তিনের আসল সমস্যা রয়েছে গোটা উম্মাহর হৃদয়ে। আর সেই হৃদয়ের অংশটুকু হলো মক্কা থেকে জেরুজালেমের মাটি -- যা ইসলামিক উম্মাহর হৃদয়। তিনি বলেন, এই এলাকার যেকোন বৈদেশিক হস্তক্ষেপই মুসলিম উম্মাহর অন্তর রোগাক্রান্ত হবার লক্ষণ। তিনি আরো বলেন, ইসরাইল খুব শীঘ্রই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।



রাশিদ আল ঘানুশিকে বলা হয় একজন "থট লিডার" যিনি ইসলামিক পদ্ধতিকে সমনাগরিক অধিকারের সাথে সমন্বয় করেছেন। নির্বাচনের আগেই ১৯ এপ্রিল, ২০১১ তারিখে মধ্যপ্রাচ্যের 'দি মাজাল্লা' পত্রিকার সাথে সাক্ষাতকারে ঘানুশি কিছু কথা বলেন। পুরনো সেই সাক্ষাতকারের চৌম্বক অংশ তুলে ধরা হলো --

দি মাজাল্লা: একদম প্রথমে বলতে চাই, নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার পরে তিউনিশিয়ার কী কী পরিবর্তন দেখছেন? দেশে কি নতুন কোন যুগের সূচনা হয়েছে?

রাশিদ আল ঘানুশি: পরম করুণাময় এবং অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি, আর দরুদ ও সালাম পেশ করছি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি। নিঃসন্দেহে নির্বাসন থেকে বাড়ি ফেরার পর আমার অবস্থান বদলে গেছে। আগে আমার অন্তরে আমার দেশ থাকলেও আমি সমস্যাগুলো বাইরে থেকে সমাধানের চেষ্টা করতাম। এখন আমি আমার নিজের মাটিতে এবং এর ফলে আমি দেশের সমস্যাগুলোর অনেক কাছাকাছি থাকছি ও দেখছি ভিন্নরকম করে।


দি মাজাল্লাঃ তিউনিশিয়ার গণআন্দোলনের পেছনে আন-নাহদার ভূমিকা কী ছিলো?

রাশিদ আল ঘানুশিঃ আমরা আন্দোলনের একটা অংশ। যেহেতু গত শতাব্দীর শেষ তিনি দশকে আমাদের ভোগান্তি ছিলো সর্বোচ্চ। আমাদের প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ কারাবন্দী হয়েছিলো, যারা যুগ যুগ ধরে নানা রকম নির্যাতন সহ্য করেছে। শত শত লোক পঙ্গু হয়ে পড়েছেন এবং অনেকজন মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের পরিবার দেখেছিলো করেছিলো নির্মমতা, তারা এতটাই লাঞ্ছনা-গঞ্জনা পেয়েছিলো যে আমাদের তিউনিসিয়াতে আমাদের আন্দোলনকর্মীদের প্রতিটি পরিবারে কেউ না কেউ কারারুদ্ধ হয়েছিলো, নয়ত নির্বাসিত হয়েছিলো, আর নাহয় তাদের তাদের শারীরিকভাবে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছিলো। এই নির্যাতন ও জুলুমের প্রভাব পড়েছিলো একনায়ক সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভগুলোকে ক্রমেই বাড়িয়ে দিতে। যার ফলে, ক্ষোভে ফুঁসে থাকা এই মানুষগুলোর চেতনার বারুদে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলো জালিম সরকারের বিরুদ্ধের এই আন্দোলন। এই আন্দোলন তাই কেবল আমাদের সংগঠনের সদস্যদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো না বরং তিউনিশিয়ার সমাজের সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ

দি মাজাল্লাঃ অতীতের দীর্ঘ তিক্ত সময়ের পরে আন্দোলনের অবস্থা কী এখন?

রাশিদ আল ঘানুশিঃ আননাহদা আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গিয়েছিলো ২০বছর ধরে ব্যাপক ধড়পাকড়ের ফলে। যারা কারাভোগ করেননি তারা নির্বাসনে ছিলেন। আন্দোলন শুরু হবার পূর্ব পর্যন্ত বিগত কয়েকবছরে কিছু সদস্য জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা ছোট কারাগার থেকে বড় কারাগারে যাবার মুক্ত হয়েছিলেন। তাদেরকে পুলিশের সার্বক্ষণিক প্রহরায় রাখা হয়েছিলো। তারপরেও তারা নিজেদের জীবন শুরু করতে পেরেছিলেন এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এখন আমরা আমাদের কর্মপদ্ধতি পুনর্গঠন করছি এবং নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে আবেদন জানিয়েছি। একটা ভালো উত্তর আশা করছি।

দি মাজাল্লাঃ এখনকার তিউনিসিয়া এবং আন-নাহদার রাজনৈতিক চিত্রটি কেমন?

রাশিদ আল ঘানুশিঃ আমরা তিউনিসিয়ার রাজনীতি ও সমাজের একটা অংশ। এখন আমরা এমন একটা সময় পার করছি যখন আমাদের নতুন একটা রাজনৈতিক সিস্টেম দাঁড় করাতে হবে। একই সাথে, তিউনিসিয়ার মানুষেরা একদলীয় শাসন এবং মাফিয়ার থাবা থেকে মুক্ত হবার এই সময়ে যেটা চাইছে তা হলো—একটি জনগণের দেশ। দেশটি অনেক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং আমরা তার সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তির একটা অংশ। আমাদের সকল মানুষের অংশগ্রহণে গড়া এই আন্দোলনকে ধারণ করতে এবং জনমানুষের একটা দেশ স্থাপন করতে আমরা জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে যোগ দিতে। এটি হবে আন্দোলনের প্রথম ধাপের ফলাফল। সব মানুষের অংশগ্রহণে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণে এই নির্বাচন ফলপ্রসূ হবে। আন্দোলনের বাইরে থাকা কেউ অথবা পূর্ববর্তী শাসকদের কোন অংশ থাকলে তা সঠিক হবেনা।

দি মাজাল্লাঃ তিউনিসিয়া এবং মিশরের এই আন্দোলন সারা বিশ্বে কেমন প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন?

রাশিদ আল ঘানুশিঃ তুরষ্ক থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া এখন গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার আলোকে চলছে। এক্ষেত্রে আরবরা পিছিয়ে ছিলো। এখন তারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে এবংনিজেরা বদলে নিচ্ছে। কিন্তু মিশরীয়দের জন্য প্রথম ধাপটি নেয়ার কারণে তিউনিসিয়া সম্মানিত বোধ করছে। আরবের দেশগুলো এখন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিতে এগিয়ে আসছে।

দি মাজাল্লাঃ আপনি কি মনে করেন ইসলামপন্থীরা সরকার হিসেবে ক্ষমতা পেলে পশ্চিমারা তা মেনে নেবে?

রাশিদ আল ঘানুশিঃ পশ্চিমারা প্রভু নয়।

দি মাজাল্লাঃ সমগ্র বিশ্বের অন্যান্য ইসলামিক সংগঠনগুলো যেমন হামাস, মুসলিম ব্রাদারহুড, আল-কায়েদার সাথে আপনাদের সম্পর্কের ধরণটা কেমন?

রাশিদ আল ঘানুশিঃ আমাদের বিশ্বাস এবং ধর্ম একই, তবে চিন্তাধারা এবং ভিন্ন অবস্থার কারণে আমারা পলিসিতে আলাদা হয়ে থাকতে পারি।




তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়াআননাহদা ওয়েবসাইট [এরাবিক]আল জাজিরা ডট কম : রাশিদ ঘানুশির সাক্ষাতকারবিবিসি -- আননাহদা মুভমেন্টদি মাজাল্লার সাথে সাক্ষাতকার

গাজায় কেন সৈন্য পাঠাচ্ছেন না প্রেসিডেন্ট মুরসি? : মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে একটি পর্যালোচনা

গাজায় ক'দিন ধরে চলছে চরম মানবিক সংকট। প্রায় দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি, হাজার হাজার মানুষ বোমার আঘাতে হাসপাতালে আহত। রিফিউজি হিসেবে ফিলিস্তিনি মাটিতে পা দেয়া ইহুদিরা ইসরাইল নামের রাস্ট্র গঠন ও তাকে টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতেই ফিলিস্তিনিদের উপরে এই সামরিক হামলা বলে মনে করেন অনেকে। সেনা, নৌ ও শক্তিশালী বিমান হামলায় বিপর্যস্ত গাজাবাসীর জীবন।

এই পরিস্থিতিতে মুসলিম বিশ্ব থেকে উল্লেখযোগ্য কোন সাহায্য দেখা যায়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে অঙ্গুলিনির্দেশ যাচ্ছে মিশরের প্রেসিডেন্ট ডক্টর মুহাম্মাদ মুরসির প্রতি। কেন তিনি প্রতিবেশি রাস্ট্র হয়েও কোন সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলেন না।  এই প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখা প্রয়োজন -- মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকা আবশ্যক একজন মুসলিমের।
আরব রাস্ট্রগুলোর বেশিরভাগ রাস্ট্রই রাজতন্ত্রের মত ব্যবস্থায় ছিল এই শতাব্দীর শুরুতেও। মিশর, তিউনিশিয়া এবং লিবিয়াতে একনায়ক সরকার ছিলো হোসনি মুবারক, বেন আলী এবং মুয়াম্মার গাদ্দাফি। মুবারকের সময়ে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে রাজনৈতিক জুলুম-পীড়ন পোহাতে হয়েছে ইসলামি মুভমেন্ট করার জন্য। আন নাহদা মুভমেন্ট এর অবস্থাও একই ছিলো তিউনিশিয়াতে। তিউনিশিয়ার মসজিদে বয়স্ক মানুষদের ছাড়া কারো ঢোকার ব্যাপারেও ছিলো কড়া সতর্কতা সরকারী বাহিনীর দিক থেকে। লিবিয়াতে গড়ে ওঠেনি গণমানুষের কোন চেতনা, গাদ্দাফির একক শক্তিতে ৪১ বছরের রাজত্ব ছিলো। সিরিয়ায় বাসার আল আসাদ এবং তার পিতা হাফিজ আল আসাদ উনিশশত সত্তর সাল থেকেই একনায়কতন্ত্র জারী রেখেছিল -- সেখানে জনগণের চিন্তার প্রতিফলন থাকার প্রশ্নই উঠেনা। 

বেন আলীর পতন হয় ফলবিক্রেতা বোয়াজিজি একনায়ক সরকারের প্রতিবাদে গায়ে আগুণ ধরিয়ে আত্মহননের পরের আন্দোলনে। এই আন্দোলনের বাতাস যায় মিশরের তাহরীর স্কোয়ারে। বছর ধরে প্রচুর উত্থান পতনের পর সামরিক সরকারের আশ্রয়ে ও শক্তিতে জারি থাকা হোসনি মুবারকের পতন হয়। মিশরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পেরিয়ে এসেছিলো বিশাল এক পথ পরিক্রমা। এরপর নির্বাচন হয়, এতে হোসনি মোবারকপন্থী সামরিক বাহিনীর প্রবল বিরোধি শক্তি প্রয়োগ সত্বেও চরম নাটকীয়তার পর মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা ডক্টর মুহাম্মাদ মুরসি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। এর আগে তিউনিশিয়াতে আন নাহদা মুভমেন্ট সাফল্যের মুখ দেখে, শাইখ রাশিদ আল ঘানুশির দক্ষ নেতৃত্বে জনগনের ভোট পেয়ে আন নাহদা কোয়ালিশন করে সরকার গঠন করে তিউনিশিয়ায়। অনেকেই এই পরিবর্তনকে আরব বসন্ত বলছেন। 

এর পূর্বের ইতিহাসের কথাও মনে রাখা জরুরি। এই সুদীর্ঘ সময়ে, বিশেষ করে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড হাসান আল বান্নার নেতৃত্বে মুভমেন্ট শুরু করার পরবর্তী ৮০ বছরের প্রায় পুরোটাই আন্দোলনের নেতাকর্মীরা জুলুম ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে পেরিয়ে আসে। সাইয়েদ কুতুব, জায়নাব আল গাজালিদের মতন অজস্র ত্যাগ স্বীকার করে ইখওয়ানের নেতাকর্মীরা। জামাল আব্দুল নাসের এবং তারপর হোসনি মোবারকের ক্ষমতার সময়ে জনমত গড়ে তোলা নিষিদ্ধ করে রাখা মুসলিম ব্রাদারহুডের জন্য অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল, তবু তারা তৃণমূল পর্যায়ে তাদের কাজ জিইয়ে রেখেছিল, যোগ্যতা বৃদ্ধি করেছিল বুদ্ধিবৃত্তিক, আধ্যাত্মিক। এই সুদীর্ঘ সময়ে দেশের সবগুলো সেক্টরকেই সেকুলারাইজড করার চেষ্টা করা হয় -- যেমন সেকুলারাইজড করা হয়েছিল তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের শাসনামলে।  আরবের অন্যান্য দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে বেশ কয়টা কারণে যার মধ্যে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা এবং সরকার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ দু'টি বিষয়। বাদশাহ ফয়সাল তেল পাইপলাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ইউরোপ ও আমেরিকার প্রাণ উড়ে গিয়েছিলো। ফলশ্রুতিতে সূক্ষ্ম চালে তাকে হত্যা করা হয়, সৌদি আরবেও শক্তিশালী সত্যভাষী নির্ভীক শাসক আর দেখা যায়না। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রগুলোর সবাই আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ককে গুরুত্বের সাথে দেখে। মিশর, তিউনিশিয়ায় চলমান জনপ্রিয় সরকারব্যবস্থা গণতন্ত্র দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে আদর্শিক দিক থেকে সমপর্যায়ের দুইটি মুভমেন্ট মুসলিম ব্রাদারহুড এবং আননাহদার ফসল হিসেবে।

এই অবস্থায় এই দুইটি রাস্ট্রকেই অনেক গভীরে গেঁথে থাকা সেকুলার সোসাইটি এবং সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলোর সৃষ্টি করা ক্রমাগত রাজনৈতিক সংকটকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সেই সাথে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সামলাতে হচ্ছে। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে -- মিশরের এই সেনাবাহিনী গড়ে উঠেছিলো দেশের একনায়কের হাতকে শক্তিশালী করার নিমিত্তে। যখন কেউ বলবে, এই সেনাবাহিনী যুদ্ধ করবে ইসরাইলি বাহিনীর সাথে, যারা বিশ্বের চতুর্থ শক্তিশালী সশস্ত্রবাহিনী, যাদের বিলিয়ন ডলারের অর্থ সাহায্য আসে যুক্তরাস্ট্র, যুক্তরাজ্য আর ইউরোপ থেকে, তখন একটা বিষয় মাথায় রাখা জরুরি -- এই সেনাবাহিনী গড়েই উঠেছে ইসরাইলি রাস্ট্রকে প্রতিষ্ঠা করতে এবং মুসলিম ফিলিস্তিনি রাস্ট্রকে নিশ্চিহ্ন করার স্পিরিটে। যে বা যারা এই সুস্পষ্ট বিষয়টাকে আমলে না নিয়ে কথা বলেন, নিঃসন্দেহে সেনাবাহিনীর স্পিরিট নিয়ে গড়ে ওঠার বিষয়টাতে তারা অজ্ঞ  ইদানিংকালে অনেকেই জিহাদ ঘোষণা নিয়ে একটা তর্ক করছিলেন, তাদের ধারণাই থাকেনা হয়ত যে যুদ্ধের একটা পরিকল্পনা থাকতে হয়। ইসলাম শত্রুর সামর্থ্যের দিকে না তাকিয়ে যুদ্ধ করলেও -- আত্মহননে উদ্বুদ্ধ করে না। অ-ইসলামিক মিশরীয় বাহিনীর সাথে অ-ইসলামিক স্পিরিটে গড়ে ওঠা আর কোন বাহিনীই কোন অবস্থাতে এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারবে না। এই বাহিনীকে গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ। কেবলমাত্র জিহাদি প্রেরণায় গড়ে ওঠা কতিপয় সংগঠন অনেক দেশেই বিরাজমান যারা এইসব ক্ষেত্রে এরদোগান আর মুরসির দিকেই অঙ্গুলিনির্দেশ করে -- যদিও সকল ক্ষেত্রেই তারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গালাগালি দেয়। তাদেরকে এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আর অবাস্তব আবেগ থেকে বেরিয়ে এসে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা করা জরুরি। 

প্রেসিডেন্ট মুরসি গাজাতে হামলা হবার প্রথম দিনেই ইসরাইল থেকে রাস্ট্রদূত ডেকে পাঠিয়েছেন, পরিষ্কার গলায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরাইলকে -- এই দৃশ্যও তো এতদিন এই বিশ্ব দেখতে পায়নি।  আমার মনে হয়, এই মূহুর্তে হামলা বন্ধ করার ব্যাপারে যদি তিনি ভূমিকা রাখেন এবং গাজাবাসী ফিলিস্তিনিদের কাছে ক্রমাগত খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা যাওয়ার ব্যাপারটা নিশ্চিতকরনের সাথে সাথে অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্য নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে আর্থিক, নৈতিক সমর্থন নিতে পারেন -- এই মূহুর্তে এটা একটি বড় প্রাপ্তি হবে। মুসলিম উম্মাহর একজন নেতা হিসেবে মুহাম্মাদ মুরসির কাছে সবাই বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী পদক্ষেপ দেখতে চায়। 

প্রকৃতপক্ষে, ইহুদিবাদকে উৎপাটন করতে ও রুখতে প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক, অর্থনৈতিক, সামরিক শক্তি। আধ্যাত্মিক বা স্পিরিচুয়াল উন্নতির আবশ্যকতাও তো অনস্বীকার্য। আমার মনে হয় সামগ্রিক উন্নতি ও প্রস্তুতির সেই সময় অবধি অপেক্ষা করা প্রয়োজন ইসরাইলকে উচ্ছেদের। যদিও এই পথ অবশ্যই অনেক বন্ধুর আর কঠিন হবে।  আশাবাদী কথা হলো, ক'দিন আগে সুদানে সারাবিশ্বের মুসলিম নেতৃবৃন্দের বৈঠক হয়েছে -- মুসলিম ব্রাদারহুডের জেনারেল গাইড ডক্টর মুহাম্মাদ বদি, তিউনিশিয়ার আননাহদা মুভমেন্টের নেতা রাশিদ আল ঘানুশি, হামাসের খালেদ মিশাল, পাকিস্তান জামাআতের সাইয়েদ মুনাওয়ার হাসানসহ সমগ্র বিশ্বের শতাধিক নেতা একত্রিত হয়েছিলেন -- কথা বলেছেন বিশ্ব পরিবর্তন নিয়ে, উম্মাহকে নিয়ে তারা একসাথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। পরিবর্তন আসছে এই পৃথিবীতে, সময়ের ব্যাপার মাত্র। নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।

27 June 2012

মিশরের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসির সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত

 গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট প্রথম প্রেসিডেন্ট। ডক্টর মুরসি মিশরের রাজনৈতিক দল "ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস" পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি এর আগে মিশরের ইসলামিক আন্দোলন মুসলিম ব্রাদারহুডের জেনারেল গাইডেন্স ব্যুরোর একজন সদস্য ছিলেন। তিনি ব্রাদারহুডের সমস্ত নেতাদের মাঝে সবচাইতে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং প্রভিভাবান যিনি বিগত কয়েক দশক ধরে স্বৈরাচার হোসনি মোবারক সরকারের শোষণ, অন্যায়, নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিয়েছেন।       


তার পুরো নাম মোহাম্মদ মুরসি ইসা আয়াত। তিনি ১৯৫১ সালের আগস্টে মিশরের শারকিয়া প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৫ সালে কায়রো ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যাচেলর ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি সম্পন্ন করেন, এরপর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ইন মেটালারজি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৭৮ সালে। পরবর্তীতে তিনি ১৯৮২ সালে ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ডক্টরেট অর্জন করেন।  তিনি কায়রো ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়াতে লেকচারার এবং টিচার অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে ড মুরসি ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ রিজে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৫ থেকে ২০১০ পর্যন্ত প্রফেসর ড মোহাম্মদ মুরসি মিশরের জাগাজিগ ইউনিভার্সিটির ম্যাটারিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের প্রধান হিসেবে কাজ করেন।   

মোবারক সরকারের একটানা শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে তার দৃপ্ত অবস্থানের জন্য ড মুরসিকে অনেকবার কারাবরন করতে হয়েছিলো। ২০০৬ সালের ১৮ মে মুরসিকে আরো ৫০০ জন ব্রাদারহুড সদস্যসহ আটক করা হয় কায়রোতে। তিনি সাত মাস কারাগারে ছিলেন।  ২৫ জানুয়ারির পর থেকে হোসনি মোবারক সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লব চলাকালীন সময়ে ২০১১ সালের ২৮ জানুয়ারিতে "ফ্রাইডে অফ অ্যাঙ্গার" এর দিন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিপ্লবে যখন অনেক কারাগার ধ্বংস করে দেয়া হয়, তখনো মুরসি কারাগার ছাড়েননি বরং স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এবং নিউজ এজেন্সিগুলোতে আহবান জানিয়েছিলেন যাতে আদৌ কোন আইনগত যৌক্তিক কারণে তাদের কারগারে প্রেরণ করা হয়েছিলো কিনা সেটা আইনজীবীদের মাধ্যমে  ভালো করে খতিয়ে দেখা হয়। 

মুহাম্মদ মুরসিকে শুধু নয়, তার পরিবারকেও অনেক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিলো। ২০০০ সালে মুরসিকে পার্লামেন্টের নমিনেশনের জন্য ঘোষনা করা হলে তার ছেলে ডক্টর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার পিতা মুহাম্মদ মুরসি যখন সংসদের এমপি ছিলেন, তখনো তাকে ৩ বার গ্রেপ্তার করা হয়।  ৫ বছর পার্লামেন্টের সদস্যকালীন সময়ে রাজনৈতিক কাজে তার সুদক্ষ আর অসাধারণ নৈপুণ্যের কারণে মুহম্মদ মুরসিকে মুসলিম ব্রাদারহুডের শুরা কাউন্সিলের "গাইডেন্স ব্যুরো" -এর একজন সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ২৫ জানুয়ারির গণআন্দোলনের পর মুরসিকে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক দল "ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি" (এফজেপি) এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করে মুসলিম ব্রাদারহুডের শুরা কাউন্সিল।   মিশরের ২০০০ সালের পার্লামেন্টের পার্লামেন্টারি ব্লকের লিডার হিসেবে মুরসি খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। তিনি সবচাইতে কর্মোদ্যমী এবং সফল সংসদ সদস্য ছিলেন। বেশ কিছু জাতীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে তিনি সুদক্ষ ভূমিকা রাখেন। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তাকে ২০০০-২০০৫ সালের কাজের জন্য সেরা পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে প্রকাশ করা হয়।  



সংকলিত এবং পরিমার্জিত করে অনুবাদ করা হয়েছে  মুসলিম ব্রাদারহুদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ইখওয়ানওয়েব ডট কম  থেকে

23 April 2012

রাসূল আমার ভালোবাসা

ছোটকালে অনেক গান শুনেছিলাম। কিছু টুকরো স্মৃতি অনেক দারুণ। তার মধ্যে এমন অসাধারণ একটা গানও আছে। গানটার কথা ভেবে চোখ ভিজে এলো। মন খারাপ হলে আমি এই গানটা মনে করি।



যখন দারুণ দুঃখ নামে আমার জীবন জুড়ে,
বিপদ-আপদ মুসিবতে মরি পুড়ে-পুড়ে
তখন তোমার, শৈশব-কৈশোর জুড়ায় যন্ত্রণা।
রাসূল আমার কাজে কর্মে অনুপ্রেরণা


আশাহত জীবন যখন দুর্বিষহ লাগে,
ব্যর্থ এবং পরাজিত স্মৃতিগুলো জাগে,
তখন তোমার, বদর-ওহুদ যুগায় সান্তনা
রাসূল আমার কাজে কর্মে অনুপ্রেরণা


কত রকম রাজার নীতি প্রজার নীতি দেখলাম
দুঃখ হয় রে দুঃখ ছাড়া আর কিছু না পেলাম।
তাইতো শুধু, মনে পড়ে সোনার মদিনা
রাসূল আমার কাজে কর্মে অনুপ্রেরণা


নেতার মতন নেতা যখন পাইনা কোথাও খুঁজে
কাঁদি শুধু কাঁদি হায়রে এ দু'টি চোখ বুঁজে
তখন তোমার, স্মরণ আমায় দেয় যে সান্তনা
রাসূল আমার কাজে কর্মে অনুপ্রেরণা


রাসূল আমার ভালোবাসা
রাসূল আমার আলো-আশা
রাসূল আমার প্রেম-বিরহের মূল আলোচনা
রাসূল আমার কাজে কর্মে অনুপ্রেরণা


আল্লাহ গীতিকার আর সুরকারদের উত্তম প্রতিদান দান করুন।
এই ভিডিও লিঙ্কটা পেলাম ইউটিউবে, দেখতে পারেনঃ http://www.youtube.com/watch?v=-v7kPBUt8p4